প্রিয়াংকা বিশ্বাস
সম্পর্কের সুতো-ছিন্নর জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলে রেস্তোরাঁয়
শেষ বিকেলের চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দেবার।
নিপাট জামাকাপড়ের মতো সম্পর্কটায় এখন শত-ছিদ্র;
অতীত রোমন্থনের কপাট বন্ধ করে দাঁড়ালাম
ঘরের কোণের চারফুট লম্বা আরশির বিপরীতে,
প্রতিবিম্বর মানুষটাকে মনে হলো দোমড়ানো-মোচড়ানো কয়েক দিস্তা কাগজের দলা।
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ক্ষণিকের নীরবতা চিরে
পায়ের পাতা জোড়া বুঝি শূন্যে ভাসছে-
ভাসতে ভাসতেই পৌঁছে গেলাম আলমারির কাছে
কপাট খুলেই টেনে নিলাম এককোণে ঝুলে থাকা নীলাম্বরি শাড়ি টা,
ভেসে এসে দাঁড়ালাম পুনরায় আরশির সামনে।
দেহের ভাঁজে জড়িয়ে নিলাম শাড়ির ময়ূরকণ্ঠী আঁচল
শাড়ির কুঁচিগুলো হঠাৎ যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করলো
কিছুতেই বুঝি আজ তারা সারিবদ্ধ হবে না
যতোই গোছাই, প্রতিবিম্বর মানুষটাকে আরো অগোছালো লাগে,
অকারণেই চোখের কাজল লেপ্টে যায়
কাঁপা কাঁপা দুই আঙ্গুল ভ্রু-মধ্যাবস্থিত উপত্যকায় টিপ পরাতে ব্যর্থ হয়।
এলোচুলেই বসলাম এসে সুপরিচিত রেস্তোরাঁয়
কোণের এক টেবিল আগলে বসেছিলে তুমি,
এমন দৃষ্টিতে চাইলে যেন আকাশের সবটুকু রঙ
ছিনিয়ে নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছি তোমার সামনে!
বললে- “নীলাম্বরি শাড়িটা আজ পরবে ভাবিনি।”
বললাম- “বছর কুড়ি বাদে হঠাৎ চায়ের তৃষ্ণা পেলে
নীলাম্বরিতে জড়ানো এই আমাকে চিনতে যেন অসুবিধা না হয় তাই…!”
বেয়ারা রেখে গেলো ধোঁয়া ওঠা দু-পেয়ালা চা
দুজনেই জানি এটাই আমাদের চা-পানের শেষ আসর।
নীরবতার মাঝেই চাপের পেয়ালা শূন্য হলো;
তুমি এগিয়ে দিলে সেগুন কাঠের সেই বাক্সটা
ডালা না তুলেও বলে দিতে পারি ভেতরে জমে আছে
ছাপান্নটা চিরকুট, পঁয়ত্রিশটা কবিতা- যার সারাংশ ছিলে তুমি।
আমিও তোমার শূন্য পেয়ালার পাশে টুক করে রাখলাম
আমার অনামিকার অলংকার।
বললাম- “আলো প্রায় নিভে এলো বলে,আসি তাহলে।”
তুমিও জানালে তোমারও তাড়া আছে।
অতঃপর শাড়ির ভাঁজের সবটুকু অবসাদ বুকপকেটে পুরে নিরুদ্দেশ হলে তুমি।
আমিও নীলাম্বরি রঙে মিলিয়ে গেলাম নাগরিক রাত্রির শরীরে।

লেখক: প্রিয়াংকা বিশ্বাস, সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
