জাফর ইকবালের আলো ছড়ানোর শুরুটা হয়েছিল গান দিয়ে। কিন্তু তাঁকে নায়ক হিসেবেই বেশি স্মরণ করা হয়। ছোটবেলা থেকেই সুর–তাল–লয়ের ভেতর বড় হওয়া এই তরুণ গিটার হাতে এলভিস প্রিসলির গান গেয়েই প্রথম মাতিয়েছিলেন চারপাশ। ১৯৬৬ সালে বন্ধুদের নিয়ে ব্যান্ড ‘রোলিং স্টোন’ গড়ে তোলেন তিনি। গায়ক হিসেবেই পরিচিতি বাড়ছিল, ঠিক তখনই জীবনে আসে সিনেমা। এক অনুষ্ঠানে মঞ্চে গান গাইছিলেন জাফর ইকবাল। সেখানেই তাঁকে নজরে আনেন নির্মাতা খান আতাউর রহমান।
তাঁর চেহারা, ব্যক্তিত্ব এতটাই টানল নির্মাতাকে যে সরাসরি বলেই ফেললেন—‘সিনেমায় অভিনয় করবে?’ জাফর রাজি, আর তাতেই শুরু ঢালিউডে এক তারকার জন্ম। ১৯৬৯ সালে ‘আপন পর’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক। এরপর ধীরে ধীরে সত্তর–আশির দশকের হার্টথ্রব নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি—রোমান্টিক, স্টাইলিশ, তুমুল জনপ্রিয়। নায়ক হলেও গান ছাড়েননি কখনো। ভাই আনোয়ার পারভেজের সুরে ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’ গানটি গেয়েই চলচ্চিত্রে গায়কের পরিচয়ও পাকাপোক্ত হয় তাঁর।
এরপর ‘সুখে থেকো ও আমার নন্দিনী’, ‘তুমি আমার জীবন’, ‘কেন তুমি কাঁদালে’—একটার পর একটা গানই তাঁকে পৌঁছে দেয় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। অডিও অ্যালবামও করেছিলেন আশির দশকে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয়তা পাওয়া গানগুলোতে তাঁর কণ্ঠ আজও গুনগুন করে অনেকের মনে। অভিনয়ে তাঁর সাফল্য আরও উজ্জ্বল। ‘মাস্তান’, ‘সূর্য সংগ্রাম’, ‘অবুঝ হৃদয়’, ‘নয়নের আলো’, ‘এক মুঠো ভাত’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘বন্ধু আমার’—প্রায় শতাধিক ছবিতে অভিনয় করে নিজ সময়কে ছাড়িয়ে এক প্রজন্মের আইকনে পরিণত হন তিনি।
ববিতার সঙ্গে তাঁর জুটি তো ছিল পর্দার তাণ্ডব—হিটের পর হিট। তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নানা গল্প ছড়ালেও দু’জনই কখনো কিছু বলেননি। পরে জীবনের সঙ্গী হিসেবে বিয়ে করেন চলচ্চিত্রের বাইরের মানুষ সোনিয়াকে; আছে দুই ছেলে। জাফর ইকবালের যাত্রায় আছে আরেক গর্ব—মুক্তিযুদ্ধ। দেশের ডাক এলে তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধে নেমেছিলেন, সেই তাড়না-আবেগ জীবনভর বয়ে বেড়িয়েছেন। দেশ স্বাধীন করে আবার পর্দায় ঝাঁপিয়ে পড়েন, যারা তাঁকে দেখেছেন এক বাক্য স্বীকার করেন ওই মানের স্টাইলিশ নায়ক বাংলাদেশে আর আসেননি।
কিন্তু আকাশে যখন তাঁর নক্ষত্র সবচেয়ে উজ্জ্বল, তখনই মৃত্যু এসে সব আলো নিভিয়ে দেয়। ১৯৯২ সালের ৮ জানুয়ারি—মাত্র ৪১ বছর বয়সে চলে যান তিনি। কাকতালীয়ভাবে তাঁর শেষ সিনেমা ‘লক্ষ্মীর সংসার’-এ দেখা গিয়েছিল তাঁকে আজিমপুরের রাস্তা খুঁজতে—এক মাস পর বাস্তবেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় সেই আজিমপুরেই। স্বল্প জীবনে তিনি যা রেখে গেছেন—তাই কিংবদন্তির চেয়ে কম নয়। গায়ক, নায়ক, স্টাইল আইকন, মুক্তিযোদ্ধা—সব মিলিয়ে জাফর ইকবাল আজও ঢাকাই সিনেমার রোমান্স ও তারুণ্যের চিরসবুজ প্রতীক।
