নভেম্বরের শুরুতেই দিল্লি ও ইসলামাবাদে দু’টি ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আবারও নড়েচড়ে বসিয়েছে। এসব হামলায় প্রাণহানি যেমন ঘটেছে, তেমনি নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সীমান্তে সতর্কতা এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বাড়িয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ভারত–পাকিস্তান কি আবার সংঘাতের ভেতরে ঢুকে পড়ছে?
দিল্লির লালকেল্লার কাছে গাড়িবোমা বিস্ফোরণে ১৩ জন নিহত হওয়ার মাত্র একদিন পর ইসলামাবাদের আদালত চত্বরে আত্মঘাতী হামলায় মারা যান অন্তত ১২ জন। ধারাবাহিকতা দেখে নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এগুলো নিছক দুর্ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিত হামলা।
এদিকে ভারত–পাকিস্তান সম্পর্কের সাম্প্রতিক উত্তেজনায় আফগানিস্তান একটি বড় ভূমিকা রাখছে। পাকিস্তানের অভিযোগ—তেহরিক–ই–তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগান মাটিতে সক্রিয় হয়ে পাকিস্তানে হামলার পরিকল্পনা করছে। আবার তারা অভিযোগ করছে, ভারত এসব গোষ্ঠীকে নানাভাবে মদদ দিচ্ছে। অন্যদিকে ভারত তাদের দাবিকে ভিত্তিহীন মনে করছে।
আফগান সীমান্তে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ এবং তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের টানাপোড়েন দুই দেশের সম্পর্ককে আরও নাজুক করে তুলেছে।
দিল্লির বিস্ফোরণের তদন্ত ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) হাতে নিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এটিকে ‘ষড়যন্ত্র’ উল্লেখ করে বলেছেন, কেউই রেহাই পাবে না। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছেন।
ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী ইতোমধ্যে সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে এবং অভিযান জোরদার করেছে। কাশ্মীরে আন্তদেশীয় সন্ত্রাসী সেল ভেঙে দেওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
দিল্লির ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইসলামাবাদে হামলা হওয়ায় পাকিস্তান দোষ চাপিয়েছে ভারতের ওপর। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এটিকে ভারতের ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের উদাহরণ’ আখ্যা দিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ সামনে আনতে পারেননি তিনি। পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ—সরকার রাজনৈতিক সুবিধা নিতে ভারতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।
ভারত ও পাকিস্তানের গণমাধ্যম বিস্ফোরণ–সংশ্লিষ্ট অভিযোগ–পাল্টা অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক বক্তব্য ও উত্তেজনামূলক সংবাদ পরিবেশ উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। এর প্রভাব সরাসরি সীমান্তের নিরাপত্তায়ও পড়তে পারে।
পারমাণবিক ক্ষমতাধর দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক সবসময়ই সূক্ষ্ম। অতীতে যেমন কারগিল যুদ্ধ, উরি, পুলওয়ামা ও বালাকোটের মতো ঘটনা সামরিক উত্তেজনা বাড়িয়েছিল, সাম্প্রতিক দুই বিস্ফোরণও সেই ধারা পুনরায় সামনে এনেছে। উভয় দেশই সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা ও নজরদারি জোরদার করেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এগুলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা; তবে ছোট ভুল বোঝাবুঝিও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করতেই যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয় দেশকে সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। তারা সতর্ক করেছে—সামান্য সামরিক উত্তেজনা দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক মহল তাই কূটনৈতিক চ্যানেল বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছে।
দিল্লি ও ইসলামাবাদের বিস্ফোরণ শুধু দুই দেশের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, সংযম, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বজায় রাখতে পারলে বড় সংঘাতের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি—কিন্তু ঝুঁকি যে বাড়ছে, তাতে সন্দেহ নেই।
