ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের উত্তরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি নতুন করে জোরদার হয়েছে। দীর্ঘদিন ভারতের পানি নিয়ন্ত্রণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত তিস্তা অঞ্চলের মানুষ এখন চীনের সহায়তায় আশার আলো দেখছেন। চীনের অর্থায়নে গঠিত এই মহাপরিকল্পনা উত্তরবঙ্গের কৃষি ও অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারে।
তিস্তা নদী ৪১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এর উৎপত্তি হিমালয়ের পাউভুন্ডি পর্বত থেকে। নদীটি ভারতের সিক্কিম ও পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং যমুনা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে যায়। নদীটি দুই দেশই কৃষি ও সেচের জন্য ব্যবহার করে। তবে ভারতের গজলডোবা বাঁধে পানি আটকে রাখার কারণে বাংলাদেশের ছয় বিভাগে লাখ লাখ কৃষক শুষ্ক মৌসুমে সেচের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, নদীর পানিশূন্যতার কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ টন চাল উৎপাদন কম হয়।
দুই দেশের মধ্যে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন দ্বন্দ্বের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৮৩ সালের অস্থায়ী চুক্তি অনুযায়ী ভারত ৩৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ৩৬ শতাংশ পানি পাবে। ২০১১ সালে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার আশা জ্বলে উঠলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে সেটিও থেমে যায়। এরপর থেকে ভারতের কেন্দ্র সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কারণে বাংলাদেশে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। অনেকেই মনে করেন, দিল্লি এখন নদী ইস্যুতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক বা অক্ষম।
দীর্ঘ অচল অবস্থার মধ্যে বাংলাদেশ তিস্তা উন্নয়ন পরিকল্পনায় চীনের দিকে ঝুঁকছে। ২০২৫ সালের মার্চে প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুস চীন সফরে গিয়ে তিস্তা নদীর জন্য ৫০ বছরের মহাপরিকল্পনা প্রস্তাব পান। চীন ইতোমধ্যেই প্রকল্পে ২.১ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রকল্পে নদীর তলদেশ খনন, জলধারা উন্নয়ন, আধুনিকায়ন, নদী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নদী তীরবর্তী স্যাটেলাইট শহর নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়াও দুই দেশ যমুনা নদীর জলবিদ্যুৎ তথ্য বিনিময়েও সম্মত হয়েছে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের এই চুক্তি ভারতের কূটনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে এটি শুধু একটি পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নয়, বরং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি নতুন অধ্যায়। তিস্তা প্রকল্পটি ভারতের উত্তরাঞ্চলের স্পর্শকাতর এলাকা, যা শিলিগুড়ি করিডর বা চিকেন নেকের কাছাকাছি অবস্থিত। ভারত আশঙ্কা করছে, চীনের উপস্থিতি যদি তিস্তা অঞ্চলে বাড়ে তাহলে তা তাদের কৌশলগত ও সামরিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। ভারতের অভিযোগ রয়েছে, লালমনিরহাটের পুরনো বিমান ঘাটিতেও চীনের প্রকৌশলীরা সক্রিয়। যদিও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। চীনের ব্রহ্মপুত্র নদীর উজানে বিশাল বাঁধ নির্মাণ ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীপথে প্রভাব ফেলতে পারে বলে নয়া দিল্লির আশঙ্কা রয়েছে।
আরও একটি কারণ হলো, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ আগামী বছর শেষ হচ্ছে। ফলে নতুন নদী চুক্তির আলোচনায় তিস্তা ইস্যু আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিস্তা এখন কেবল একটি নদী নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সংযোগবিন্দু। বাংলাদেশের উত্তরের মানুষের কাছে এটি কৃষি ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় স্বপ্ন, যা বাস্তবায়ন না হলে উন্নয়নের সম্ভাবনা ও নিরাপত্তা দুইই ঝুঁকিতে পড়বে।
