ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাজ্য থেকে ইউরোপ ভ্রমণকারীদের জন্য শুরু হয়েছে নতুন এক যুগ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহুল প্রতীক্ষিত ডিজিটাল সীমান্ত ব্যবস্থা ‘এন্ট্রি/এক্সিট সিস্টেম’ (ইইএস) রোববার (১২ অক্টোবর) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। বহুবার বিলম্বের পর চালু হওয়া এই প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা ইউরোপ ভ্রমণকে আরও নিরাপদ, আধুনিক ও কার্যকর করতে সহায়তা করবে বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে যাত্রী নিবন্ধনের কারণে কিছু জায়গায় দীর্ঘ সারি বা অপেক্ষার সৃষ্টি হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
ইইএস মূলত ইউরোপের শেনজেন অঞ্চলের সীমান্তে প্রবেশ ও প্রস্থানের সময় নন-ইইউ দেশগুলোর নাগরিকদের যাতায়াতের তথ্য সংরক্ষণ করবে। বর্তমানে এই অঞ্চলে ২৯টি দেশ রয়েছে, যার মধ্যে জনপ্রিয় গন্তব্য ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও গ্রিস অন্তর্ভুক্ত। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যসহ ইইউ–বহির্ভূত দেশের নাগরিকদের আঙুলের ছাপ ও মুখের ছবি দিতে হবে। এটি পাসপোর্টে ম্যানুয়াল সিল দেওয়ার পুরোনো প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিস্থাপন করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে পুরো ইউরোপজুড়ে ইইএস ব্যবস্থা কার্যকর হবে। ডোভার বন্দরে প্রথমে কোচে ভ্রমণকারীদের জন্য ১২ অক্টোবর থেকে এই সিস্টেম চালু হয়েছে। অন্যান্য পর্যটকদের জন্য তা ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হবে। ইউরোস্টারের ক্ষেত্রে প্রথমে কিছু নির্বাচিত ব্যবসায়ী যাত্রী এই সেবা ব্যবহার করবেন, পরে ধীরে ধীরে সকল যাত্রীর জন্য উন্মুক্ত করা হবে। ইউরোটানেলও একই তারিখ থেকে সীমিতভাবে কোচ ও মালবাহী পরিবহনের ক্ষেত্রে এ সিস্টেম চালু করছে। বছরের শেষ নাগাদ ইউরোপের বিভিন্ন বিমানবন্দরেও নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিলের মধ্যে ২৯টি অংশগ্রহণকারী দেশের সব সীমান্তে ইইএস সম্পূর্ণভাবে চালুর লক্ষ্য নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
নতুন ব্যবস্থায় প্রথমবার ভ্রমণের সময় যাত্রীদের পাসপোর্ট স্ক্যান, আঙুলের ছাপ ও মুখের ছবি দিতে হবে। এই প্রক্রিয়া সীমান্ত কর্মকর্তার সহায়তায় বা স্বয়ংক্রিয় কিয়স্ক মেশিনে সম্পন্ন হবে। বিমানে ভ্রমণকারীদের গন্তব্য বিমানবন্দরে নিবন্ধন করতে হবে, আর ডোভার, ইউরোটানেল বা ইউরোস্টার ব্যবহারকারীদের যাত্রার আগেই যুক্তরাজ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। ১২ বছরের নিচের শিশুদের আঙুলের ছাপ নেওয়া হবে না। নিবন্ধনের সময় কিয়স্কে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন থাকবে—যেমন কোথায় থাকবেন, কতদিন থাকবেন এবং পর্যাপ্ত অর্থ আছে কি না।
ডোভার বন্দর নতুন চেকিং প্রক্রিয়ার জন্য বিশাল পরিবর্তন এনেছে। সমুদ্র থেকে ভূমি পুনরুদ্ধার করে তৈরি করা হয়েছে আলাদা প্রসেসিং জোন, যেখানে যাত্রীরা ইইএস নিবন্ধন সম্পন্ন করবেন। ইউরোস্টার লন্ডনের সেন্ট প্যানক্রাস টার্মিনালে ৪৯টি নতুন কিয়স্ক বসিয়েছে, আর ইউরোটানেল দুই পাশেই শতাধিক কিয়স্ক স্থাপন করেছে, যেখানে গাড়িচালকরা গাড়ি থেকেই নিবন্ধন করতে পারবেন। যাত্রীদের সুবিধার্থে একটি মোবাইল অ্যাপও তৈরি করা হয়েছে, যাতে সীমান্তে পৌঁছানোর আগে কিছু ধাপ সম্পন্ন করা যায়। নিবন্ধনের মেয়াদ থাকবে তিন বছর, যার মধ্যে প্রতিবার ভ্রমণের সময় তথ্য যাচাই করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, প্রত্যেক যাত্রীর নিবন্ধনে কয়েক মিনিট অতিরিক্ত সময় লাগলে ডোভার বা ইউরোটানেলের মতো ব্যস্ত জায়গায় দীর্ঘ সারি ও যানজটের সৃষ্টি হতে পারে। তবে ইউরোটানেল ও ইউরোস্টার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে বড় কোনো বিশৃঙ্খলা হবে না। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ইইএসের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরেকটি নতুন অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে—‘ইউরোপীয়ান ট্রাভেল ইনফরমেশন অ্যান্ড অথরাইজেশন সিস্টেম’ বা ইটিআইএএস। এটি হবে অনলাইনভিত্তিক ভিসা–ওয়েভার বা পূর্বানুমোদন প্রক্রিয়া, যা পাসপোর্টের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ইইউ–বহির্ভূত দেশের নাগরিকরা, যেমন যুক্তরাজ্যের নাগরিকরাও, ইউরোপে প্রবেশের আগে অনলাইনে আবেদন করে এই অনুমোদন নিতে পারবেন। ২০২৬ সালের শেষের দিকে এটি চালু হওয়ার কথা, যদিও নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। আবেদন ফি হবে ২০ ইউরো বা প্রায় ১৭ ব্রিটিশ পাউন্ড, যা তিন বছর পর্যন্ত বৈধ থাকবে। তবে ১৮ বছরের নিচে এবং ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে আবেদনকারীদের জন্য এটি বিনামূল্যে থাকবে।
সবশেষে বলা যায়, ইউরোপে ভ্রমণকে আরও নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ইইএস একটি বড় পদক্ষেপ। প্রথমদিকে যাত্রীরা কিছুটা ভোগান্তিতে পড়লেও ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষের আশা—নতুন এই ডিজিটাল ব্যবস্থাই ভবিষ্যতের ভ্রমণকে করে তুলবে আরও দ্রুত, স্মার্ট ও নির্ভুল।
