ছবি: সংগৃহীত
ইরানের সাবেক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর শাসনামলে ভয়ংকর কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা সাভাক—যার প্রধান কাজ ছিল বিরোধীদের ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন ও হত্যা করা। এই সংস্থার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান পারভেজ সাবেতি (৮৯) ৪৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ছদ্মনামে বিলাসী জীবন কাটানোর পর এখন অতীতের সেই ভয়াবহ অপরাধের দায়ে আইনি জটিলতায় জড়িয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে ‘পিটার’ নামে পরিচিত সাবেতি ফ্লোরিডার উইন্ডারমেরে এলাকায় এক অভিজাত ম্যানশনে বাস করছিলেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি ছিলেন সাধারণ এক শান্তশিষ্ট বৃদ্ধ। কিন্তু সম্প্রতি পরিচয় ফাঁস হয়ে যায় তাঁর, আর তখনই প্রকাশ্যে আসে তাঁর অতীত ভয়াবহ ইতিহাস।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসরত তিন সাবেক রাজনৈতিক বন্দী সাবেতির বিরুদ্ধে ২২৫ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ২,৪০০ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ মামলা করেছেন। তাঁদের দাবি, শাহ আমলে তেহরানের কারাগারে সাবেতির নির্দেশেই তাঁদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছিল—যার মধ্যে ছিল বৈদ্যুতিক শক, ধর্ষণ, পানিতে চুবানো এবং নখ উপড়ে ফেলা।
তাঁরা আরও জানান, সাভাক কারাগারে ‘অ্যাপোলো’ নামে এক ভয়ঙ্কর নির্যাতনযন্ত্র ব্যবহার করা হতো। এতে একটি ধাতব হেলমেট পরাতে হতো, ফলে নির্যাতিত ব্যক্তি যন্ত্রণায় চিৎকার করলে সেই আওয়াজ বহুগুণে ফিরে এসে আরও অসহনীয় হয়ে উঠত।
সাবেতির আইনজীবীরা মামলাটি খারিজের আবেদন করেন, যুক্তি দেন যে অভিযোগের সময়সীমা পার হয়ে গেছে। কিন্তু ফ্লোরিডার ফেডারেল বিচারক গ্রেগরি প্রেসনেল সেই আবেদন আংশিকভাবে নাকচ করে দেন। আদালত বলেন, নির্যাতনের শিকারদের সুরক্ষা আইনের আওতায় মামলা গ্রহণযোগ্য। আগামী বছরে এ মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
১৯৭৮ সালে স্ত্রী নাসরিনকে নিয়ে সাবেতি তেহরান থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। ফাঁস হওয়া মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নথি বলছে, তাঁরা ইরান থেকে ২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ নিয়ে পালিয়ে আসেন। যুক্তরাষ্ট্রে এসে নাম বদলে পিটার ও ন্যান্সি হিসেবে নতুন পরিচয়ে ব্যবসা শুরু করেন এবং অন্তত আটটি বিলাসবহুল সম্পত্তি ক্রয় করেন।
তবে ২০২৩ সালে তাঁদের এক মেয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরানবিরোধী এক বিক্ষোভে বাবার ছবি টুইট করলে তাঁর আসল পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়। এরপরই সাবেক বন্দীরা মামলা দায়ের করতে সক্ষম হন।
বর্তমানে সাবেতি নাকি শাহের পুত্র রেজা পাহলভীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করছেন।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী সারা কোলন আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “আমার মক্কেলরা এখন ন্যায়বিচারের এক ধাপ কাছাকাছি।” তিনি জানান, মামলার পর থেকেই তাঁদের হুমকি ও ভয়ভীতি দেওয়া হচ্ছে।
‘ইরানি কালেক্টিভ ফর জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ নামের সংস্থাটি বলেছে, এই মামলা ইরানে বহু দশক ধরে চলা নিপীড়নের চক্র থামাতে সহায়তা করবে। সংস্থার এক মুখপাত্র বলেন, “সব ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারী, এবং নির্যাতনে জড়িত যে-ই হোক, তাকে জবাবদিহির মুখে দাঁড়াতে হবে।”
