ছবিঃ সংগৃহীত
ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে বহু প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজার পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। দখলদার ইসরায়েলি বাহিনী উপত্যকার কয়েকটি এলাকা থেকে পিছু হটতে শুরু করেছে, আর সেই সঙ্গে পরিত্যক্ত ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি।
শুক্রবার (১০ অক্টোবর) সকাল থেকেই গাজার বিভিন্ন সড়কে মানুষের ঢল নেমেছে। ধুলোমাখা পথে সারি সারি পরিবার, শিশু-বৃদ্ধ সবার মুখে একটুখানি শান্তির ছোঁয়া। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্মম অভিযানে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজা সিটিতেও মানুষের ফেরার যাত্রা শুরু হয়েছে।
গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকার বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী ইসমাইল জায়দা বলেন, “আল্লাহকে ধন্যবাদ যে আমার বাড়িটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু চারপাশ ধ্বংস হয়ে গেছে, আমার প্রতিবেশীদের বাড়িঘরসহ পুরো এলাকা নিশ্চিহ্ন।”
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা থেকে যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এর আগে ভোরে ইসরায়েলি সরকার হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব অনুমোদন দেয়। ফলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাজার কয়েকটি এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ স্থগিতের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, হামাস আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জীবিত থাকা ২০ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে, আর ইসরায়েল কারাগার থেকে ২৫০ জন দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেবে। পাশাপাশি যুদ্ধ চলাকালে আটক থাকা আরও ১,৭০০ ফিলিস্তিনিকেও ছেড়ে দেওয়া হবে।
চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গাজায় শত শত ট্রাকভর্তি খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতিসংঘ ও মানবিক সংগঠনগুলো। ঘরবাড়ি হারানো লাখো ফিলিস্তিনির জন্য এসব সহায়তা এখন অত্যন্ত জরুরি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গৃহীত এই যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে গাজার প্রধান শহরাঞ্চল থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সরবে। তবে উপত্যকার প্রায় অর্ধেক এলাকা এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, “ট্রাম্পের পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপগুলোতে গাজা যাতে সামরিকীকরণমুক্ত হয় এবং হামাস যাতে অস্ত্র সমর্পণ করে; তা নিশ্চিত করতে ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় অবস্থান করবে। যদি এটা সহজে অর্জন করা যায় তবে ভালো, আর যদি না হয় তবে তা কঠিন উপায়ে অর্জন করা হবে।”
গাজার দক্ষিণে খান ইউনিস অঞ্চলে সীমান্ত সংলগ্ন কয়েকটি এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের সরে যেতে দেখা গেছে। তবে রয়টার্স জানিয়েছে, এখনো কিছু এলাকায় গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। নুসিরাত ক্যাম্প থেকেও কিছু সেনা পূর্ব সীমান্তে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল বরাবর রাস্তা থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর ৪০ বছর বয়সী মাহদি সাকলা বলেন, “যুদ্ধবিরতির খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা খুব খুশি হয়ে গাজা সিটিতে আমাদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেই। যদিও সেখানে কোনো বাড়ি নেই, সব ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও আমরা শুধু আমাদের বাড়ির জায়গায়, এমনকি ধ্বংসস্তূপের ওপর ফিরতে পেরে আনন্দিত। দুই বছর ধরে আমরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বাস্তুচ্যুত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি।”
হামাসের নির্বাসিত গাজা প্রধান খলিল আল-হায়া জানিয়েছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে যুদ্ধ শেষ হওয়ার বিষয়ে নিশ্চয়তা পেয়েছেন।
এই যুদ্ধ গাজা ও সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে ইরান, ইয়েমেন ও লেবানন পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েল আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, আর মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কও টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে।
এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত ৬৭ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যদিও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এখনও বেশ কিছু বিষয়ে চুক্তি হয়নি—এর মধ্যে রয়েছে বন্দিমুক্তির পূর্ণ তালিকা প্রকাশ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। হামাসও এখনও ইসরায়েলের নিরস্ত্রীকরণের দাবি মেনে নেয়নি।
গাজায় তাই আপাত শান্তির মধ্যেও ঝুলে আছে অনিশ্চয়তার ঘন ছায়া।
