মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সরকারি অচলাবস্থার (শাটডাউন) কারণে কার্যত থমকে গেছে দেশটির বিমান চলাচল ব্যবস্থা। টানা ৩৬ দিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের শাটডাউনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টি বড় বিমানবন্দরে ফ্লাইট সংখ্যা ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) জানিয়েছে, কর্মী সংকটের কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় তারা এই কঠিন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। ফলে শুক্রবার (৭ নভেম্বর) থেকেই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ফ্লাইট বিলম্ব ও বাতিলের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রয়টার্স জানায়, চলমান ৩৬ দিনের শাটডাউন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ। এর আগে ২০১৮ সালের শেষ থেকে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ৩৪ দিন স্থায়ী হয়েছিল সরকারি অচলাবস্থা।
বর্তমান সংকটেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসন ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলছে। ডেমোক্র্যাটরা দাবি করছে, স্বাস্থ্যবিমার ভর্তুকি বাড়ানো না হলে তারা বাজেট বিল অনুমোদন করবে না। কিন্তু রিপাবলিকানরা তাদের সেই শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।
পরিবহণমন্ত্রী শন ডাফি বলেন, “আমাদের প্রধান দায়িত্ব আকাশপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সিদ্ধান্তটি কঠিন হলেও এটি রাজনৈতিক নয়, বাস্তব নিরাপত্তা বিবেচনা থেকেই নেওয়া হয়েছে।”
এফএএ প্রশাসক ব্রায়ান বেডফোর্ড জানান, ফ্লাইট কমানোর প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে চালু করা হবে—প্রথম দিনে ৪ শতাংশ, শনিবার ৫ শতাংশ, রোববার ৬ শতাংশ, এবং আগামী সপ্তাহ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে আন্তর্জাতিক রুটগুলো আপাতত এই কাটছাঁটের আওতায় পড়বে না।
সরকার বিমানবন্দরগুলোর নাম প্রকাশ না করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি, শিকাগো, আটলান্টা, লস অ্যাঞ্জেলেস ও ডালাসসহ অন্তত ৩০টি ব্যস্ত বিমানবন্দর এতে প্রভাবিত হবে। বিশ্লেষণ সংস্থা সিরিয়াম (Cirium) জানিয়েছে, এ সিদ্ধান্তে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফ্লাইট এবং ২ লাখ ৬৮ হাজার আসন কমে যাবে।
শাটডাউনের কারণে বর্তমানে ১৩ হাজার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার ও ৫০ হাজার নিরাপত্তা কর্মকর্তা বেতন ছাড়াই কাজ করছেন। এতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলে ইতোমধ্যে লক্ষাধিক ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে এবং প্রায় ৩২ লাখ যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন।
ইউনাইটেড এয়ারলাইনস জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ও প্রধান রুটগুলোতে ফ্লাইট স্বাভাবিক থাকবে, তবে দেশীয় ও আঞ্চলিক রুটে কাটছাঁট করা হবে। যেসব যাত্রী ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বের শিকার হবেন, তারা সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত পাবেন।
আমেরিকান এয়ারলাইনস জানিয়েছে, তাদের যাত্রীদের ওপর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকবে। অন্যদিকে সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইনস জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছে এবং দ্রুত যাত্রীদের অবহিত করবে।
ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ইউনিয়ন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টস—সিডব্লিউএ’ এক বিবৃতিতে শাটডাউনকে ‘মার্কিন জনগণের ওপর নিষ্ঠুর আঘাত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সংগঠনের সভাপতি সারা নেলসন বলেন, “ফেডারেল কর্মীদের বেতন দেওয়া কিংবা স্বাস্থ্যসেবা রক্ষা—এ দুটির মধ্যে কোনোটি বেছে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। যারা এই সংকট সৃষ্টি করেছেন, তাদেরই সমাধান করতে হবে।”
রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ফেডারেল সরকারের কার্যক্রম প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ডেমোক্র্যাটরা বাজেট বিল অনুমোদনে অনড় অবস্থান নিয়েছে, আর রিপাবলিকানরা সেটি প্রত্যাখ্যান করছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন জনজীবনে শাটডাউনের প্রভাব আরও প্রকট করে ডেমোক্র্যাটদের ওপর চাপ বাড়াতে চাইছে।
