ছবি: সংগৃহীত
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু গল্প লুকিয়ে থাকে, যেখানে একজন মানুষের জীবনও তার জাতির করুণ পরিণতির সামনে ক্ষুদ্র হয়ে যায়। উইলিয়াম ল্যানি, যিনি ইতিহাসে ‘কিং বিলি’ নামে পরিচিত, ছিলেন এমন একজন মানুষ। কোনো যুদ্ধে নিহত হননি, তবুও তার গোটা জাতি প্রায় পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুর পরও তাকে শান্তিতে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়নি; তার দেহ নিয়ে গবেষণা চলেছে এবং তাকে দাফন করতে লেগেছিল দীর্ঘ ১২২ বছর।
উইলিয়াম ল্যানি ছিলেন তাসমানিয়ার শেষ পূর্ণ রক্তের আদিবাসী পুরুষ। তার বাবা-মা উভয়েই তাসমানিয়ার স্থানীয় পালাওয়া জাতির মানুষ ছিলেন। তাই তিনি কোনো ইউরোপীয় রক্তের মিশ্রণ ছাড়া জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ইতিহাসে তিনি কিং বিলি নামে পরিচিত।
১৮০৩ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশকারীরা তাসমানিয়ায় এসে ঘোষণা দেয় যে দ্বীপে কোনো মানুষ নেই, ফলে জমিটি তারা দখল করতে পারে। এই বর্ণবাদী মানসিকতার ফলেই পালাওয়া জনগোষ্ঠীকে বিলুপ্তির দিকে ধাক্কা দেওয়া হয়। ‘কালো যুদ্ধ’ শুরুর পর হাজার হাজার পুরুষ নিহত হন, নারী ও শিশুদের বন্দি করে ফ্লিন্ডার্স দ্বীপে পাঠানো হয়।
শিশু অবস্থায় ল্যানি এই গণহত্যা থেকে বেঁচে যান। বড় হয়ে দেখেন তার পুরো জাতি বিলুপ্তের পথে, এবং পূর্ণ রক্তের একজন পুরুষ হিসেবে তিনিই একমাত্র বেঁচে আছেন।
৩৪ বছর বয়সে যক্ষ্মায় মৃত্যুবরণ করেন উইলিয়াম ল্যানি। তবে মৃত্যুর পর আরও নির্মম পরিস্থিতি শুরু হয়। হোবার্টের মেডিকেল কলেজ ও জাদুঘরে তার দেহ নিয়ে গবেষণার নামে রাতের বেলা খুলি, হাত-পা ও শরীরের অন্যান্য অংশ কেটে নেওয়া হয়। তার দেহাংশ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইউরোপের গবেষণাগারে ছিল। তাসমানিয়ার আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালান দেহের অবশিষ্টাংশ ফিরিয়ে আনার জন্য।
অবশেষে ১৯৯১ সালে, মৃত্যুর ১২২ বছর পর, উইলিয়াম ল্যানির দেহ তাসমানিয়ায় ফেরত আনা হয়। সেখানে তাকে দাফন করা হয়, সেই মাটিতে যেখানে তার পুরো জাতি বিলুপ্ত হওয়ার আগে বাস করত। কিং বিলির গল্প আজও এক জাতির যন্ত্রণাদায়ক সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছে।
