ছবি: সংগৃহীত
দুই বছরের দীর্ঘ ও বিধ্বংসী যুদ্ধ শেষে ধ্বংসস্তূপে পরিণত উত্তর গাজায় ফিরতে শুরু করেছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা। যুদ্ধবিরতির পর যখন তারা নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরছেন, তখন চোখে পড়ছে কেবল পোড়া ঘর, ভাঙা দেয়াল, আর ছাইভস্মে পরিণত জনপদ। সেই ধ্বংসের ভেতর থেকেই নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন তারা।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—গাজা শহরকে নতুন করে গড়ে তুলতে কতদিন সময় লাগবে? জাতিসংঘের আবাসন অধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি বালাকৃষ্ণ রাজাগোপাল সতর্ক করে বলেছেন, এই বিপর্যয়ের পর গাজাকে পুনর্গঠন করতে কয়েক প্রজন্ম সময় লাগতে পারে।
শনিবার (১১ অক্টোবর) আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজাগোপাল বলেন, “উত্তর গাজায় যারা ফিরছেন, তারা ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই পাচ্ছেন না। যুদ্ধের মানসিক ক্ষত এতটাই গভীর যে, পুনর্গঠন মানে শুধু স্থাপনা নয়—মানুষের মনকেও নতুন করে গড়ে তোলা।”
তিনি আরও জানান, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ইসরায়েলি বাহিনী গাজার কয়েকটি এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করেছে। এতে করে লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি নিজেদের ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গাজার ৯২ শতাংশ আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে।
রাজাগোপাল বলেন, “এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—ইসরায়েল যেন অবিলম্বে গাজায় তাঁবু, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও মানবিক সহায়তা প্রবেশের অনুমতি দেয়। সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ না শিথিল করলে সহায়তা পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
তিনি উল্লেখ করেন, গাজার পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ হতে হবে মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অবকাঠামো পুনঃস্থাপন—যেমন পানি, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা ও আশ্রয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডে এখন তাঁবুই একমাত্র আশ্রয়।
জাতিসংঘের এই বিশেষজ্ঞ গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞকে ‘ডোমিসাইড’ বা গণআবাস ধ্বংস হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, পরিকল্পিতভাবে বসতবাড়ি ধ্বংস করে মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা এক ধরনের জাতিগত নিধনের কৌশল, যা আন্তর্জাতিক আইনে জাতিহত্যার উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রাজাগোপাল স্মরণ করিয়ে দেন ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’-র কথা, যখন ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন। তার ভাষায়, “গাজার সাম্প্রতিক ধ্বংসযজ্ঞ সেই নাকবারই পুনরাবৃত্তি। এক প্রজন্মের পর আরেক প্রজন্ম উচ্ছেদ ও বঞ্চনার উত্তরাধিকার বহন করছে।”
জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসাব বলছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া যুদ্ধ থেকে এখন পর্যন্ত ৬৭ হাজার ৭০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। লাখো মানুষ এখনও তাঁবুতে আশ্রয়হীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞ রাজাগোপালের মতে, “গাজার পুনর্গঠন কেবল ইট-পাথরের কাজ নয়—এটি ন্যায়, মানবিকতা ও রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রশ্ন। যতদিন পর্যন্ত দখলদারিত্ব ও অবরোধের নীতি বহাল থাকবে, ততদিন গাজার ভবিষ্যৎও ধ্বংসস্তূপেই পড়ে থাকবে।”
