পশ্চিমতীরে ভূমি নিবন্ধন সংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরাইল সরকার
পশ্চিমতীরে ভূমি নিবন্ধন সংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরাইল সরকার। এতে দখলকৃত এ ভূখ-ে ইসরাইলি ইহুদিদের জমি কেনা সহজ হবে এবং ভূমি রেজিস্ট্রি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। মন্ত্রিসভার এ সিদ্ধান্তের পর ফিলিস্তিনিদের মধ্যে কার্যত সংযুক্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে ইসরাইলের টানা হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা। সহায়সম্বল হারিয়ে লাখ লাখ মানুষ এখন আশ্রয় নিয়েছেন বিভিন্ন শিবিরে। এমনই এক শিবিরে বালুর ওপর অস্থায়ীভাবে তৈরি করা হয়েছে একটি বক্সিং রিং। সেখানে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে কয়েক ফিলিস্তিনি কিশোরী। যুদ্ধের ভয়াবহতা আর মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতেই তারা বেছে নিয়েছে বক্সিং। খবর আলজাজিরার।
সমালোচকদের মতে, পশ্চিমতীরে জমির মালিকদের তথ্য প্রকাশ হলে ফিলিস্তিনিরা চাপ ও হয়রানির মুখে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে হেবরনের অবৈধ ইহুদি বসতি ও ইব্রাহিমি মসজিদ এলাকার নির্মাণ অনুমোদনের ক্ষমতা ফিলিস্তিনি পৌরসভার কাছ থেকে নিয়ে ইসরাইলের হাতে দেওয়া হয়েছে। ইব্রাহিমি মসজিদের পরিচালক মোতাজ আবু স্নেইনা বলেন, এটি ১৯৬৭ সালের পর সবচেয়ে গুরুতর পদক্ষেপ। তার অভিযোগ, হেবরনের পুরোনো শহরে ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা হচ্ছে। ১৯৯৪ সালে সেখানে এক ইহুদি বন্দুকধারীর হামলায় ২৯ ফিলিস্তিনি নিহত হন। এরপর মসজিদটি ইহুদি ও মুসলিমদের জন্য ভাগ করা হয়। বর্তমানে কয়েকশ’ ইহুদি বসতি স্থাপনকারী সেনা সুরক্ষায় শহরের বড় অংশে প্রভাব বিস্তার করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হেবরনে যা ঘটছে, তা অন্য শহরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বেথলেহেমে একটি মসজিদ এলাকার ব্যবস্থাপনাও ইসরাইলের অধীনে নেওয়ার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ বেড়েছে। ফিলিস্তিনিরা বলছেন, এসব পদক্ষেপ ধাপে ধাপে পশ্চিমতীরে স্থায়ী ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এদিকে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে বক্সিং প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন ওসামা আইয়ুব। গাজার উত্তরাঞ্চলে তার একটি বক্সিং ক্লাব ছিল, যা ইসরাইলি হামলায় বাড়িসহ ধ্বংস হয়ে যায়। বাস্তুচ্যুত হয়ে খান ইউনিসে আশ্রয় নেওয়ার পর নতুন করে আবারও বক্সিং প্রশিক্ষণ শুরু করেন তিনি। তার কাছে প্রশিক্ষণ নেওয়া মেয়েরাও সবাই বাস্তুচ্যুত পরিবারের সদস্য।
তবে এই প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুলতে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে ওসামাকে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে যা পাওয়া গেছে, তা দিয়েই তৈরি হয়েছে কাঠের রিং। সেখানে নেই ম্যাট বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ৮ থেকে ১৯ বছর বয়সী এসব কিশোরীকে সপ্তাহে তিন দিন প্রশিক্ষণ দেন ওসামা। এর জন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিক নেন না। তার ভাষ্য, যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ ও প্রিয়জন হারানোর শোক মেয়েদের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। বক্সিং তাদের জন্য আবেগ প্রকাশ ও মানসিক চাপ মুক্তির একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
এদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার প্রশাসন পরিচালনা ও পুনর্গঠন তত্ত্বাবধানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক গঠিত ফোরাম বোর্ড অব পিসে সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে যোগ দিয়েছে ইসরাইল। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় নেতানিয়াহু বলেছেন, ওয়াশিংটনে ব্লেয়ার হাউজে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। সেখানে আমি বোর্ড অব পিসে সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলকে অন্তর্ভুক্তি করা বিষয়ক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছি।
তারপর হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের যে অটুট মিত্রতা তাকে আরও শক্তিশালী করতে আমি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উভয়েই প্রস্তুত। উল্লেখ্য, গাজার যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থার জন্য ইসরাইল সরাসরি দায়ী।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরাইলের ভূখ-ে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা ও ২৫১ জনকে জিম্মি হিসেবে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরের দিন ৮ অক্টোবর থেকে গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। আইডিএফের দুই বছরের নিষ্ঠুর অভিযানে গাজায় নিহত হয়েছেন ৭২ হাজার ফিলিস্তিনি, যাদের একটি বড় অংশই নারী ও শিশু, সেই সঙ্গে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে পুরো গাজা উপত্যকা। দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরাইলকে গাজায় অভিযান বন্ধের আহ্বান জানালেও তাতে কর্ণপাত করেননি নেতানিয়াহু। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের চাপে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় ইসরাইল।
২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য ২০টি পয়েন্ট সম্বলিত একটি পরিকল্পনা পেশ করেন ট্রাম্প। ইসরাইল ও হামাস উভয়ে সেই পরিকল্পনায় সম্মতি জানানোর পর গত ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয় সেই পরিকল্পনা। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনায় উল্লেখ ছিল যে যুদ্ধবিরতির পর গাজার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি অনির্বাচিত টেকনোক্র্যাট সরকার এবং সেখানকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠন করা হবে, যার নাম হবে ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ)।
