মাটির গভীরে লুকানো এক ভয়াবহ জগৎ যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, বাতাসে ভাসে আতঙ্কের গন্ধ। এই অন্ধকার জগতের নাম ‘রাকেফেত’, ইসরায়েলের একটি গোপন ভূগর্ভস্থ কারাগার যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম প্রতীক হিসেবে আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে।
দ্য গার্ডিয়ান এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮০–এর দশকে ভয়ংকর অপরাধীদের রাখার জন্য নির্মিত এই কারাগারটি পরবর্তীতে অমানবিক পরিবেশের কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর, ইসরায়েলের উগ্রপন্থী নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির পুনরায় খুলে দেন এই নিষিদ্ধ অন্ধকার কারাগারের দরজা।
বর্তমানে কোনো অভিযোগ ছাড়াই সেখানে আটক রয়েছেন কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি নাগরিক। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি তাদের মধ্যে আছেন এক পুরুষ নার্স ও এক তরুণ খাবার বিক্রেতা, যারা শুধু ভুল সময়ে ভুল জায়গায় থাকার অপরাধেই বন্দি হয়েছেন।
বন্দিদের বর্ণনা অনুযায়ী, রাকেফেতের কক্ষগুলো সম্পূর্ণ অন্ধকার ও বায়ুশূন্য না আছে জানালা, না বাতাস চলাচলের পথ। দিন-রাত অন্ধকারে বন্দি থেকে অনেকে শ্বাসকষ্টে ভোগেন, ঘুম হারিয়ে ফেলেন, মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। প্রহরীরা কুকুর দিয়ে ভয় দেখায়, লাথি মারে, আর খাবার দেওয়া হয় অতি সামান্য পরিমাণে।
ইসরায়েলি সংস্থা পিসিএটিআই (Public Committee Against Torture in Israel) প্রথম এই গোপন কারাগারের অস্তিত্ব প্রকাশ করে। সংস্থাটির আইনজীবী জেনান আবদু জানান, ভারী অস্ত্রধারী রক্ষীদের পাহারায় দুর্গন্ধময় সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার সময় চারপাশে পচা পোকামাকড় আর শ্বাসরুদ্ধকর গন্ধে পরিবেশ অসহনীয় হয়ে ওঠে। তার ভাষায়, “যদি একজন আইনজীবীর সঙ্গে এমন আচরণ হয়, তবে বন্দিদের অবস্থা কল্পনাই করা যায় না।”
একজন বন্দি নার্স সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি জানেন না তিনি কোথায় আছেন শুধু জানতে চান, তার পরিবার এখনও বেঁচে আছে কি না। আরেকজন তরুণ বিক্রেতা জানতে চেয়েছিলেন, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সন্তান জন্ম দিতে পেরেছেন কি না; কিন্তু প্রহরীরা তার কথা শেষ করার আগেই জোর করে কথোপকথন বন্ধ করে দেয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, রাকেফেত ইসরায়েলের ‘অদৃশ্য নরক’, যেখানে মানুষকে কোনো বিচার ছাড়াই বন্দি করে রাখা হচ্ছে। আলোহীন অন্ধকার, অক্সিজেনবিহীন কক্ষ আর নির্যাতনের ভয়ের এই সমন্বয়ে রাকেফেত আজ হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত দুঃস্বপ্ন, যেখানে বেঁচে থাকাটাই যেন এক অনন্ত শাস্তি।
