ঢাকা মঙ্গলবার ১২ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৪শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
প্রচ্ছদ সারাবিশ্ব মহাসাগরের মাঝে মুসলিম দ্বীপ, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার অংশ!

মহাসাগরের মাঝে মুসলিম দ্বীপ, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার অংশ!

ছবি: সংগৃহীত

গুগল ম্যাপে ভারত মহাসাগরের গভীরে তাকালে চোখে পড়ে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপপুঞ্জ—চারপাশে কেবল নীল জলরাশি, হাজার কিলোমিটার দূরেও কোনো স্থলভাগের অস্তিত্ব নেই। এই অনিন্দ্য সুন্দর দ্বীপপুঞ্জের নাম কোকোস (Cocos) দ্বীপপুঞ্জ, যা আজ অস্ট্রেলিয়ার একটি বাইরের অঞ্চল। প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিশেল এই দ্বীপপুঞ্জকে করে তুলেছে রহস্যময় ও মোহনীয়।
প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে ১৬০৯ সালে ব্রিটিশ নৌ অফিসার উইলিয়াম কিলিং এই দ্বীপ আবিষ্কার করেন, যখন তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে ইন্দোনেশিয়ার পথে ছিলেন। দীর্ঘদিন দ্বীপটি জনশূন্যই ছিল, কারণ ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর কাছে এর তেমন গুরুত্ব ছিল না।

পরবর্তীতে ১৮২৬ সালে স্কটিশ নাবিক ক্যাপ্টেন জন ক্লুনি রস ও ইংরেজ ব্যবসায়ী আলেকজান্ডার হেয়ার এখানে এসে বসতি স্থাপনের চেষ্টা করেন। দু’জনের মধ্যে শুরু হয় আধিপত্যের লড়াই, এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হন ক্লুনি রস। তিনি দ্বীপে নারকেল বাগান স্থাপন করেন এবং ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে শ্রমিক আনেন। এখান থেকেই দ্বীপের সঙ্গে যুক্ত হয় “কোকোস” বা “কোকোনাট” নামটি।

রস পরিবারের নিয়ন্ত্রণে দ্বীপটি একসময় তাদের ব্যক্তিগত রাজ্যে পরিণত হয়, এবং এখানকার মালয় শ্রমিকদের বংশধররাই আজকের কোকোসের মূল বাসিন্দা।
বর্তমানে দ্বীপটির অধিবাসীদের বেশিরভাগই কোকোস মালয় মুসলমান। তারা মালয় ভাষায় কথা বলেন, ইসলামী রীতি মেনে জীবনযাপন করেন এবং নিয়মিত নামাজ আদায় করেন। ২৭টি দ্বীপের মধ্যে মাত্র দুটি—হোম আইল্যান্ড ও ওয়েস্ট আইল্যান্ডে মানুষের বসবাস রয়েছে। হোম আইল্যান্ডে মালয় মুসলিম সম্প্রদায় বসবাস করেন, আর ওয়েস্ট আইল্যান্ডে রয়েছে প্রশাসনিক দপ্তর, বিমানবন্দর ও স্কুল।

বিশ্বজুড়ে উপনিবেশগুলো যখন স্বাধীনতা পাচ্ছিল, তখন কোকোস দ্বীপেরও ভাগ্য পরিবর্তন হয়। ১৯৫৫ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ট্রেলিয়ার বাইরের অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৭৮ সালে অস্ট্রেলিয়া সরকার রস পরিবারের কাছ থেকে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ ক্রয় করে নেয়।

এরপর ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত গণভোটে দ্বীপবাসীরা সিদ্ধান্ত নেয়—তারা অস্ট্রেলিয়ার অধীনে থাকতে চায়। এর ফলে তারা পায় অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব, প্রশাসনিক সুরক্ষা এবং নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা।
কোকোস দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য এককথায় বিস্ময়কর। *নর্থ কোকোস দ্বীপ ও আশপাশের এলাকা ‘পুলো কিলিং ন্যাশনাল পার্ক’ নামে পরিচিত। এখানে রয়েছে অসংখ্য এন্ডেমিক স্পেসিস—অর্থাৎ এমন প্রাণী ও পাখি যাদের পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো বাফ ব্যান্ডেড রেল, ছোট ও দ্রুতগতির এক দুর্লভ পাখি।

এছাড়া রয়েছে রঙিন প্রবাল, সামুদ্রিক কচ্ছপ, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও স্পঞ্জ, যা এই অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমে পরিণত করেছে।

পরিবেশ রক্ষায় অস্ট্রেলীয় কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত কঠোর। একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১৪৪ জন পর্যটককে দ্বীপে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে এখানকার পরিবেশ এখনো শান্ত, নির্মল ও প্রায় অক্ষত। নারকেল গাছের সারি, নরম বালুকাবেলা আর নীল সমুদ্রের ঢেউ মিলে এটি যেন সত্যিকারের এক স্বপ্নদ্বীপ।

দ্বীপে রয়েছে একটি ভূগর্ভস্থ জলাধার বা ‘ওয়াটার লেন্সেস’, যেখানে বৃষ্টির পানি জমে তৈরি হয় মিঠা পানির স্তর—যেখান থেকে দ্বীপবাসীরা তাদের পানীয় জলের চাহিদা মেটান।
দ্বীপটির নিচে রয়েছে এক প্রাচীন আগ্নেয় পর্বতের ধ্বংসাবশেষ, যার নাম ময়েরফিল্ড সি মাউন্ট। ধারণা করা হয়, এই অগ্নুৎপাতের ফলেই কোকোস দ্বীপপুঞ্জের সৃষ্টি। বর্তমানে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহর থেকে কান্তাসলিংক এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইট কোকোস এয়ারপোর্টে যাত্রী পৌঁছে দেয়। সময় লাগে প্রায় ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা।

একদিকে ভারত মহাসাগরের গভীর নীল প্রকৃতি, অন্যদিকে শতাব্দীপ্রাচীন মালয় মুসলিম সংস্কৃতি—তার মাঝখানে অস্ট্রেলীয় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কোকোস দ্বীপপুঞ্জের অনন্য সৌন্দর্য ও পরিচয়।
প্রকৃতি এখানে স্থির, কিন্তু ইতিহাস ও মানুষের জীবনধারা বয়ে চলেছে নিজস্ব ছন্দে—এক জীবন্ত বৈপরীত্যের স্বপ্নদ্বীপ, কোকোস।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

অনুসন্ধান

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদক ও প্রকাশক

মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া (তুহিন)

নির্বাহী সম্পাদক

সোনিয়া রহমান

অফিসঃ

৪৯ মতিঝিল (৮ম তলা), শাপলা ভবন, শাপলা চত্বর, ঢাকা - ১০০০

ই-মেইলঃ

rightwayciezs@gmail.com

টেলিফোনঃ

+৮৮ ০১৭১২-৭৭৭ ৩৬৩

মার্কেটিংঃ

+৮৮ ০১৯৪৮- ৯০০ ৯১১

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব rightwaynews24.com কর্তৃক সংরক্ষিত