ঢাকা মঙ্গলবার ১২ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৪শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
প্রচ্ছদ অর্থনীতি ফেলে দেওয়া কাপড়ে দিনবদলের গল্প

ফেলে দেওয়া কাপড়ে দিনবদলের গল্প

পাবনা পৌর সদরের সাধুপাড়া মহল্লার দেলোয়ারা খাতুনের (৫০) স্বামী মারা গেছেন ১৮ বছর আগে। একটি মাত্র ছেলে তার। তাকেও করিয়েছেন বিয়ে। তার সংসারেও রয়েছে দুটি সন্তান। পাঁচ সদস্যের সংসার চলছিল ছেলের দিনমজুরী করে আনা টাকায়। এমন পরিস্থিতিতে সংসারে আর্থিক সহযোগিতা করতে দেলোয়ারা কাজ শুরু করেন ঝুট কারখানায়। সেখান থেকে তার মাসে আয় হচ্ছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এখন মা ও ছেলের উপার্জনে স্বচ্ছলতা এসেছে সংসারে।

শুধু দেলোয়ারা খাতুনের জীবনেই নয়, এমন গল্প ছড়িয়ে আছে হাজারো হতদরিদ্র মানুষের জীবনে। যাদের অন্ধকার জীবনে আলো ফুটিয়েছে ঝুট কারখানাগুলো। অনেক বৃদ্ধ মানুষও শেষ জীবনে কারো মুখাপেক্ষী না থেকে ঝুট কারখানা থেকে আয় করে নিজের খরচ নিজে চালাচ্ছেন।

ঝুট কাপড় অর্থাৎ গার্মেন্টেসের উচ্ছিষ্ট কাপড় দিয়ে সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে পাবনার হোসিয়ারি শিল্পে। ঝুট কাপড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে গেঞ্জিসহ নানা বস্ত্র। যা সুনাম কুড়িয়েছে বিদেশেও।

পাবনা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের তথ্য মতে, বর্তমানে ঝুট কাপড় থেকে উৎপাদিত বস্ত্র থেকে বছরে আয় হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এ শিল্পে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার নারী-পুরুষের।

হোসিয়ারি ব্যবাসায়ীরা জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত তৈরি পোশাক কারখানায় প্রতিদিন ফেলে দেওয়া হয় নমুনা ও কাটিংয়ের কাপড়। যা ঝুট কাপড় হিসেবে পরিচিত। সেই ঝুট কাপড় কিনে এনে উন্নতমানের গেঞ্জিসহ নানা বস্ত্র তৈরি করছেন পাবনার হোসিয়ারী ব্যবসায়ীরা।

সাধুপাড়া মহল্লার মামুন হোসিয়ারির মালিক মামুন হোসেন বলেন, ‘প্রথমে ঝুট কাপড় কিনে আনার পর প্রসেসিং ও কাটিং করা হয়। তারপর সেলাই মেশিনে তৈরি হয় গেঞ্জিসহ নানা পরিধেয় বস্ত্র। এরপর বিভিন্ন ডিজাইনের ছাপ দেওয়া শেষে প্যাকেজিং করা হয়। এমনই কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে উৎপাদিত বস্ত্র চলে যাচ্ছে সারা দেশে। সুনাম কুড়িয়ে রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও।’ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য মতে, গত এক দশকে পাবনা সদর উপজেলার আশপাশে বিভিন্ন গ্রামে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা গড়ে তুলেছেন ঝুট কাপড় থেকে গেঞ্জি তৈরির ৫৪২টি হোসিয়ারি কারখানা। প্রতিবছর এসব কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ কোটি পিস গেঞ্জি। যার বাজারমূল্য ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা।

এস এ হোসিয়ারীর স্বত্ত্বাধিকারী আলাল উদ্দিন প্রামানিক বলেন, ‘আমি প্রায় ১৫ বছর ধরে এই ব্যবসা করছি। আমার কারখানায় ৭০ থেকে ৭৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। খরচ বাদে মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকা লাভ থাকে। বলা যায়, ঝুট কাপড়ই আমাদের হোসিয়ারি শিল্পের প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীর ভাগ্য ফিরেছে এই ব্যবসায়।’

রাসেল গার্মেন্টস-এর মালিক আলহাজ আব্দুল আজিজ বলেন, ‘আগে গার্মেন্টস চাকরি করতাম। ১০ বছর আগে চাকরি ছেড়ে ২-৩টি সেলাই মেশিন নিয়ে নিজের এলাকায় এসে কাজ শুরু করি। এরপর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন আমার কারখানায় ১০০ মেশিন চলে। ২০০ শ্রমিক কাজ করেন। এখানকার তৈরি পোশাক দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভারত, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছি। সরকার থেকে সুদ মুক্ত ঋণ পেলে এ খাতে আমরা আরো মানুষের কর্মসংস্থান করে দিতে পারবো।’

রুমী খাতুন নামে এক শ্রমিক বলেন, ‘অনেক বেকার যুবক ও গ্রামের দরিদ্র অসহায় নারীরা কারখানায় কাজ করে মাসে অন্তত ১৫ হাজার টাকা আয় করছেন। ফলে অনেকের সংসারের অভাব চলে গেছে। স্বামী সন্তান নিয়ে সবাই সুখে আছেন। ঝুট কারখানাগুলো আমাদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।’

ষাটোর্ধ্ব চাঁদ আলী নামে প্রবীণ শ্রমিক বলেন, ‘আমরা এই বয়সে সংসারের বোঝা হয়ে যাই। ছেলে-মেয়েরা ভরণপোষণ দিতে চায় না। ঝুট কারখানা আমাদের কষ্ট দূর করেছে। আমরা এখন নিজেদের খরচ নিজেরাই চালাই। কারো দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না।’

পাবনা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের সভাপতি মনির হোসেন পপি বলেন, ‘এই জেলার হোসিয়ারি শিল্পের সুনাম দেশজুড়ে। বিদেশেও অনেক সুনাম হয়েছে। যার কারণে ভারত ও মালয়েশিয়ায় আমাদের গেঞ্জিসহ অন্যান্য বস্ত্র রপ্তানি হচ্ছে। আমরা আরো অনেক দেশে রপ্তানি করতে চাই। এজন্য দরকার আর্থিক সহযোগিতা। কারণ আমাদের পুঁজি অল্প। সুদমুক্ত ঋণ পেলে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবেন পাবনার ব্যবসায়ীরা।’

পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সাইফুল আলম স্বপন চৌধুরী বলেন, ‘করোনা মহামারি ও ইউক্রেনসহ বহির্বিবিশ্বের যুদ্ধ পরিস্থিতি পাবনার হোসিয়ারি শিল্পকে ধাক্কা দিয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী কারখানা বন্ধ করে দিয়েছিল। ধীরে ধীরে আবার প্রাণ ফিরেছে। এ শিল্পের প্রসারে ও বস্ত্র রপ্তানিতে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।’

0 FacebookTwitterPinterestEmail

অনুসন্ধান

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদক ও প্রকাশক

মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া (তুহিন)

নির্বাহী সম্পাদক

সোনিয়া রহমান

অফিসঃ

৪৯ মতিঝিল (৮ম তলা), শাপলা ভবন, শাপলা চত্বর, ঢাকা - ১০০০

ই-মেইলঃ

rightwayciezs@gmail.com

টেলিফোনঃ

+৮৮ ০১৭১২-৭৭৭ ৩৬৩

মার্কেটিংঃ

+৮৮ ০১৯৪৮- ৯০০ ৯১১

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব rightwaynews24.com কর্তৃক সংরক্ষিত