ঢাকা বুধবার ২০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২রা জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
প্রচ্ছদ জাতীয় গাজা যুদ্ধ বন্ধে অবদান রাখলো যেসব ’মুসলিম দেশ’

গাজা যুদ্ধ বন্ধে অবদান রাখলো যেসব ’মুসলিম দেশ’

ইসরাইল-হামাস যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টা পরেই প্যারিসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় ও আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এই সম্মেলনে গাজার যুদ্ধপরবর্তী শাসন ব্যবস্থা, পুনর্গঠন এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্যারিস সম্মেলনের উদ্দেশ্য ও অংশগ্রহণকারীরা
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বৈঠক উদ্বোধন করে বলেছেন, “আগামী কয়েক ঘণ্টা গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ণায়ক হবে।” তিনি জোর দিয়েছেন যে প্যারিস সম্মেলনের উদ্দেশ্য হচ্ছে মার্কিন উদ্যোগের পাশাপাশি কাজ করা। ইইউ এর পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাটজা কালাস বলেছেন, “এটি আমাদের এখনই সবচেয়ে ভালো সুযোগ। তবে যুদ্ধপরবর্তী পরিকল্পনায় আমাদের কাজ করতে হবে যাতে এটি টেকসই হয়।”

বৈঠকের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল গাজা শাসন ব্যবস্থা, ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য দেশের সামরিক প্রতিশ্রুতি মূল্যায়ন। ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল নিরাপত্তা, শাসন এবং যুদ্ধপরবর্তী ফিলিস্তিনি অঞ্চলের পুনর্গঠন।
অংশগ্রহণকারী দেশ: এই ঐতিহাসিক বৈঠকে অংশ নিয়েছে ইউরোপীয় কুইন্টেড (ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি ও স্পেন) এবং আরব কুইন্টেড (মিশর, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডান)। এছাড়া অংশ নেয় ইইউর প্রতিনিধি, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা ও তুরস্ক।
মধ্যস্থতাকারীরা: কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আল থানি (যিনি যুদ্ধবিরতির অন্যতম মধ্যস্থতাকারী) এবং মিশর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের দেশগুলো হামাসকে চুক্তিতে রাজি করাতে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছে।

ফরাসি প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা মিশন
ফ্রান্স একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা মিশন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এগিয়ে নিয়ে চলেছে, যা যুদ্ধ শেষে আইডিএফের স্থান নেবে এবং হামাস নিরস্ত্রীকরণে কাজ করবে।

পছন্দের প্রার্থী: এই প্রস্তাবে মিশর, জর্ডান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারকে পছন্দের প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মিশনের কাঠামো ও লক্ষ্য: ফরাসি প্রস্তাব অনুযায়ী, এই বাহিনী জাতিসংঘ কর্তৃক অনুমোদিত হবে এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য হবে: যুদ্ধবিরতি নিরীক্ষণ, ফিলিস্তিনি জনগণকে সুরক্ষা প্রদান, হামাসের পর্যায়ক্রমে নিরস্ত্রীকরণ এবং মানবিক প্রবেশাধিকার ও মৌলিক সেবা সুবিধা প্রদান।

মোতায়েন পরিকল্পনা: প্রস্তাবিত মিশন দুই পর্যায়ে মোতায়ন করা হবে। প্রথম পর্যায়ে যুদ্ধবিরতি নিরীক্ষণ ও নিরাপত্তা প্রদানের পর দ্বিতীয় পর্যায়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (PA) কাছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে। এই বাহিনী কসোভো ও পূর্ব তিমুরের অনুরূপ জাতিসংঘ মিশনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ভূমিকা: স্থিতিশীলতা মিশন গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতিতে সহায়তা এবং গাজার পুনর্গঠন কার্যক্রম সমন্বয় করবে। ফরাসি প্রস্তাব অনুযায়ী, ১০,০০০ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সজ্জিত করার পর্যায়ক্রমিক পরিকল্পনা রয়েছে।

PA-এর প্রত্যাশা: ২০০৭ সালে হামাস ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে গাজা থেকে বিতাড়িত করলেও, ট্রাম্পের পরিকল্পনায় তাদের ভবিষ্যৎ ভূমিকার ইঙ্গিত রয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ যুদ্ধপরবর্তী গাজায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আশা করছে। যদিও ট্রাম্পের পরিকল্পনায় আপাতত তাদের সরিয়ে রাখা হয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা ইসরাইলি আপত্তি সত্ত্বেও তাদের অবস্থান নিশ্চিত করতে আরব সমর্থনের ওপর ভরসা রাখছে।

বৈঠকের ভিত্তি: নিউইয়র্ক ঘোষণা এবং ইসরাইলের সমালোচনা
ম্যাক্রোঁ সিবিএস টেলিভিশনকে বলেছেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও টনি ব্লেয়ারের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এই বৈঠকের ভিত্তি হচ্ছে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের যৌথ উদ্যোগে গৃহীত নিউইয়র্ক ঘোষণা, যা দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের রূপরেখা প্রদান করেছে।

নিউইয়র্ক ঘোষণায় যা রয়েছে:

গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, সব জিম্মি মুক্তি এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ব্যাপক মানবিক সহায়তা।

যেকোনো দখলদারিত্ব ও জোরপূর্বক জনস্থানান্তর প্রত্যাখ্যান।

হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও বহিষ্কার, গাজার পুনর্গঠন।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা মিশন প্রতিষ্ঠা।

ইসরাইলের তীব্র সমালোচনা: ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্যারিস সম্মেলনের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, এটি ‘অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর’। তিনি অভিযোগ করেছেন যে ফরাসি উদ্যোগ ইসরাইলের পিছনে ‘গোপনে রান্না করা হয়েছে’। ইসরাইল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই বৈঠক এড়িয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও মার্কিন সরকারি বন্ধের কারণে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তা উপস্থিত থাকার কথা জানানো হয়েছিল। ফরাসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় ঘনিষ্ঠ রয়েছে।

বৈঠকে গাজার জরুরি মানবিক প্রয়োজন মেটানো এবং ব্যাপক পুনর্গঠন কার্যক্রমের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস চুক্তিকে ঐতিহাসিক সুযোগ বলে অভিহিত করে জাতিসংঘ মানবিক সাহায্য বিতরণ বৃদ্ধি ও গাজার পুনর্গঠনে কাজ করবে বলে জানিয়েছেন। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাঁ-ইভ লে দ্রিয়ঁ (Jean-Yves Le Drian) বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গাজায় দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এই প্যারিস বৈঠক গাজার যুদ্ধপরবর্তী ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। যদিও ইসরাইলি আপত্তি ও বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই সমন্বিত উদ্যোগ গাজায় দীর্ঘমেয়াদী শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে পারে। ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ফ্রান্স গাজা স্থিতিশীলতা বাহিনীতে ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুত, তবে সফলতা নির্ভর করবে সব পক্ষের সহযোগিতা—বিশেষত ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর। যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী পর্যায়গুলোর সফল সম্পাদন এই অঞ্চলে নতুন শান্তিযুগের সূচনা করতে পারে।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

অনুসন্ধান

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদক ও প্রকাশক

মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া (তুহিন)

নির্বাহী সম্পাদক

সোনিয়া রহমান

অফিসঃ

৪৯ মতিঝিল (৮ম তলা), শাপলা ভবন, শাপলা চত্বর, ঢাকা - ১০০০

ই-মেইলঃ

rightwayciezs@gmail.com

টেলিফোনঃ

+৮৮ ০১৭১২-৭৭৭ ৩৬৩

মার্কেটিংঃ

+৮৮ ০১৯৪৮- ৯০০ ৯১১

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব rightwaynews24.com কর্তৃক সংরক্ষিত