ঢাকা মঙ্গলবার ২৭শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১১ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১৫ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
প্রচ্ছদ রাজনীতি আঙুল হারানো শ্রমিক থেকে চতুর্থবারের প্রেসিডেন্ট, লুলার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন

আঙুল হারানো শ্রমিক থেকে চতুর্থবারের প্রেসিডেন্ট, লুলার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন

দারিদ্র্য, শ্রমিক আন্দোলন, কারাবাস ও রাজনৈতিক পরাজয় পেরিয়ে ব্রাজিলের ক্ষমতায় আবারও লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা

কারখানায় কাজ করতে গিয়ে হারিয়েছিলেন বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুল। শৈশব কেটেছে দারিদ্র্য আর অভাবের সঙ্গে লড়াই করে। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা না থাকলেও শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন ব্রাজিলের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। জীবনে এসেছে পরাজয়, দুর্নীতির মামলায় কারাবাস ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। কিন্তু প্রতিবারই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।

৮১ বছরে পা রাখার প্রাক্কালে আরও একবার ইতিহাস গড়েছেন ব্রাজিলের এই বামপন্থি নেতা। ২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয় দফার ভোটে ডানপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ব্রাজিলের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, লুলা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ। প্রথম দফায় পিছিয়ে থাকার পর দ্বিতীয় দফায় জয় ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল।

লুলার এই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন রাজনীতিকের সাফল্যের গল্প নয়; বরং শ্রমিক আন্দোলন, সামাজিক কল্যাণনীতি এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার এক দীর্ঘ ইতিহাস।

দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে কারখানায়

১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের পারনামবুকো রাজ্যের গারানহুনস শহরে এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম লুলার। আট সন্তানের পরিবারের একজন হিসেবে শৈশবেই অভাবের বাস্তবতা তাঁকে দেখতে হয়েছে। খরা ও আর্থিক সংকটের মধ্যে ১৯৫২ সালে তাঁর মা সন্তানদের নিয়ে সাও পাওলো অঞ্চলে পাড়ি জমান।

পরিবারের জীবিকা নির্বাহে ছোটবেলায় জুতো পালিশ, চিঠি বিলি এবং নানা ধরনের ছোটখাটো কাজ করেছেন লুলা। মাত্র ১৪ বছর বয়সে কারখানায় কাজ শুরু করেন। পরে যন্ত্রচালনা ও ধাতব কাজে পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে নিজের কর্মজীবন এগিয়ে নেন।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর একটি ঘটে কারখানায় কাজ করার সময়। দুর্ঘটনায় বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুল হারান তিনি। এই অভিজ্ঞতা এবং শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও অধিকার নিয়ে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি তাঁকে শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি আরও আগ্রহী করে তোলে।

প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা না থাকলেও পরবর্তী সময়ে ব্রাজিলের রাজনীতিতে অসামান্য প্রভাব বিস্তার করেন লুলা। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশজুড়েই ছিল শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার। 】

শ্রমিক নেতা থেকে রাজনৈতিক সংগঠক

শ্রমিক ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পর দ্রুতই পরিচিতি পান লুলা। ১৯৭৫ সালে সাও বার্নার্দো দো কাম্পু ও দিয়াদেমার ধাতব শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। সামরিক শাসনের সময় শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও অধিকার আদায়ের দাবিতে বড় বড় ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি অর্জন করেন।

১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালের শ্রমিক আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব ব্রাজিলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন শক্তির উত্থান ঘটায়। শ্রমিকদের দাবি আদায়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে ১৯৮০ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় আটক থাকার পর প্রায় ৩১ দিন কারাগারে কাটান তিনি।

তবে কারাবাস তাঁর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি। ১৯৮০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শ্রমিক আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন ওয়ার্কার্স পার্টি—পর্তুগিজ ভাষায় পার্তিদু দুশ ত্রাবালিয়াদোরেস, সংক্ষেপে পিটি। পরবর্তী সময়ে দলটি ব্রাজিলের বামপন্থি রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।

পরাজয়ের পর পরাজয়, তবু থামেননি

রাজনীতিতে প্রবেশের পরপরই ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাতে পারেননি লুলা। ১৯৮২ সালে সাও পাওলো রাজ্যের গভর্নর নির্বাচনে পরাজিত হন। এরপর ১৯৮৯, ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তাঁকে পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হয়।

তবে প্রতিটি পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক কৌশল বদলেছেন তিনি। শ্রমিক আন্দোলনের পরিচিতিকে জাতীয় নেতৃত্বে রূপ দেওয়ার পাশাপাশি মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ী শ্রেণির আস্থাও অর্জনের চেষ্টা করেন।

অবশেষে ২০০২ সালের ২৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন লুলা। তাঁর প্রথম বিজয়ের দিনটি এবারের নির্বাচনী জয়ের তারিখের সঙ্গেও মিলে গেছে। মধ্যপন্থি ব্যবসায়ী জোসে আলেনকারকে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বেছে নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমর্থন গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

২০০৩ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর প্রথম প্রেসিডেন্সি। ২০০৬ সালে পুনর্নির্বাচিত হয়ে ২০১০ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে দেশ পরিচালনা করেন তিনি।

সামাজিক কর্মসূচিতে বদলে যায় বহু মানুষের জীবন

লুলার প্রথম দুই মেয়াদের অন্যতম প্রধান পরিচিতি ছিল দারিদ্র্য হ্রাস ও সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচি। তাঁর সরকারের সময় ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’ নামের নগদ সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য এই উদ্যোগ খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাঁর শাসনামলে সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রে উঠে আসে। সমর্থকদের কাছে লুলার রাজনৈতিক পরিচয়ের বড় অংশ হয়ে ওঠে দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রচেষ্টা।

একই সঙ্গে তাঁর সরকারের সময়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ ও উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব নীতি তাঁকে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।

দুর্নীতির মামলা ও ৫৮০ দিনের কারাবাস

২০১০ সালে দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে ক্ষমতা ছাড়লেও লুলার রাজনৈতিক জীবন সেখানেই থেমে থাকেনি। ২০১১ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হন তিনি। চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে উঠলেও কয়েক বছরের মধ্যে দুর্নীতির মামলায় জড়িয়ে পড়েন।

ব্রাজিলের বহুল আলোচিত ‘কার ওয়াশ’ দুর্নীতিবিরোধী তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। ২০১৭ সালে একটি মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর ২০১৮ সালে কারাগারে যান লুলা। প্রায় ৫৮০ দিন বন্দি থাকার পর ২০১৯ সালের নভেম্বরে মুক্তি পান তিনি।

পরবর্তী সময়ে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর বিরুদ্ধে মামলার বিচারিক এখতিয়ারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাতিল করে এবং বিচারক সার্জিও মোরোর নিরপেক্ষতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। ২০২১ সালে এসব আইনি সিদ্ধান্তের ফলে লুলা রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পান। এর মধ্য দিয়ে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পথ খুলে যায় তাঁর সামনে।

২০২২ সালে প্রত্যাবর্তন, ২০২৬ সালে নতুন ইতিহাস

২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোকে পরাজিত করে ক্ষমতায় ফেরেন লুলা। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয় মেয়াদ শুরু করেন তিনি। আমাজন বনাঞ্চল সংরক্ষণ, সামাজিক কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্রাজিলের ভূমিকা জোরদার করা তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।

কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচন ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি কঠিন পরীক্ষা। প্রথম দফার ভোটে লুলা প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। প্রথম দফায় ফ্লাভিও পেয়েছিলেন ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং লুলা ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট।

এরপর দ্বিতীয় দফার প্রচারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা, সরাসরি ভোটারদের কাছে পৌঁছানো এবং রাজপথের প্রচারণায় জোর দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ২৫ অক্টোবরের ভোটে লুলা ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ কোটি ৪২ লাখ ৫৬ হাজার ২৩২। ফ্লাভিও বলসোনারো পান ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট।

এই জয়ের মধ্য দিয়ে লুলা ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ইতিহাসে চারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার নজির গড়েছেন। তাঁর নতুন মেয়াদ শুরু হবে ২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি।

চতুর্থ মেয়াদে সামনে কঠিন পরীক্ষা

নির্বাচনে জয় পেলেও লুলার সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়। জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক চাপ, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক বিভাজনের পাশাপাশি বিরোধীদের শক্তিশালী উপস্থিতির মধ্যেই তাঁকে নতুন সরকার পরিচালনা করতে হবে।

পরিবেশ সুরক্ষা ও আমাজন বনাঞ্চল রক্ষার উদ্যোগও তাঁর নতুন মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে এসব নীতি বাস্তবায়নে আইনসভায় রাজনৈতিক সমর্থন আদায় এবং বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা গড়ে তোলা বড় পরীক্ষা হতে পারে।

জুতো পালিশ করা ও কারখানায় শ্রমিকের কাজ করা থেকে শুরু করে চারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার এই পথ সহজ ছিল না। আঙুল হারানোর দুর্ঘটনা, শ্রমিক আন্দোলন, নির্বাচনী পরাজয়, কারাবাস এবং রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন—সব মিলিয়ে লুলার জীবন আজ ব্রাজিলের রাজনীতির এক অসাধারণ অধ্যায়।

তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতীক। আর ব্রাজিলের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর নতুন বিজয় প্রমাণ করে, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রতিকূলতা পেরিয়ে আবারও জনসমর্থন অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। লুলার চতুর্থ মেয়াদ সেই সম্ভাবনারই নতুন পরীক্ষা।

 

তথ্যসূত্র: ইউরো নিউজ

0 FacebookTwitterPinterestEmail

অনুসন্ধান

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদক ও প্রকাশক

মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া (তুহিন)

নির্বাহী সম্পাদক

সোনিয়া রহমান

অফিসঃ

৪৯ মতিঝিল (৮ম তলা), শাপলা ভবন, শাপলা চত্বর, ঢাকা - ১০০০

ই-মেইলঃ

rightwayciezs@gmail.com

টেলিফোনঃ

+৮৮ ০১৭১২-৭৭৭ ৩৬৩

মার্কেটিংঃ

+৮৮ ০১৯৪৮- ৯০০ ৯১১

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব rightwaynews24.com কর্তৃক সংরক্ষিত