নওগাঁয় শ্যালিকাকে বিয়ে করায় নবদম্পতিকে মুখে কালি মাখিয়ে ও গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকা থেকে বিতাড়িত করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের বিরুদ্ধে
নওগাঁয় শ্যালিকাকে বিয়ে করার জেরে মাসুদ রানা (৩৫) ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী পূর্ণিমাকে (২১) লাঞ্ছিত করে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের মুখে কালি মাখিয়ে এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে বদলগাছীতে ভাড়া বাসায় থাকতে গিয়েও স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়েছিলেন তাঁরা। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
গত রোববার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় পরিবারের সম্মতি ও প্রথম স্ত্রী মৌসুমীর (২৮) অনুমতি নিয়ে শ্যালিকা পূর্ণিমাকে বিয়ে করেন মাসুদ রানা। তিনি নওগাঁ সদর উপজেলার বাসিন্দা এবং নওগাঁ জজ কোর্টে আইনজীবীর সহকারী হিসেবে কাজ করেন। তাঁর দুই স্ত্রীর বাড়ি মহাদেবপুর উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামে।
বিয়ের পর মাসুদ রানা ও পূর্ণিমা তাঁদের বিয়ের খবর ফেসবুকে প্রকাশ করেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরে বিয়ের ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।
এরই মধ্যে বিয়ের খবর প্রকাশ্যে আসার পর মাসুদ রানাকে নিজের সেরেস্তার সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দিয়ে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন নওগাঁ জজ কোর্টের আইনজীবী মো. শাহীন কাদির ডলার।
এদিকে, বদলগাছী উপজেলার সদর ইউনিয়নের বৈরাগীপাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকতে গেলে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি মাসুদ রানা ও পূর্ণিমাকে বাধা দেন এবং ভয়ভীতি দেখান বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সোমবার (২৬ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ভাড়াবাসার মালামাল নিয়ে তাঁরা বদলগাছী ছেড়ে মহাদেবপুরে শ্বশুরবাড়িতে চলে যান।
অভিযোগ উঠেছে, সেখানেও তাঁদের লাঞ্ছিত করা হয়। স্থানীয় কিছু ব্যক্তি মাসুদ রানা ও পূর্ণিমার মুখে কালি মাখিয়ে এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেন। তবে এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুই স্ত্রীর সঙ্গে মাসুদ রানা
‘ছেলেকে ফেরত চাই, বিচার চাই’
মাসুদ রানার মা জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছেলের মুখে কালি মাখানো ও গলায় জুতার মালা পরানোর দৃশ্য দেখেছেন তিনি। এরপর থেকে ছেলের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারছেন না।
তিনি বলেন, “আমি ফেসবুকের মাধ্যমে আমার ছেলের মুখে কালি ও গলায় জুতার মালা দেওয়ার বিষয়টি দেখেছি। এরপর থেকে আমার ছেলের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ হচ্ছে না। আমার ছেলে যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাহলে তার জন্য আইন আছে, আদালত আছে। তারা (স্থানীয়রা) কেন শাস্তি দেবেন? আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই। যারা আমার ছেলেকে মারধর করেছে, তাদের বিচার চাই।”
‘নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছি’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে মাসুদ রানা বলেন, পরিবার ও প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই তিনি বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু বিয়ের পর থেকে সমাজে নানা ধরনের লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মাসুদ রানা বলেন, “আমি পরিবার ও প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমে এই বিয়ে করেছিলাম। বিয়ের পর সমাজে আমি নানাভাবে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছি। সর্বশেষ আমার বড় স্ত্রী আমাকে তালাক দিয়েছে। এরপরও আমি পরিবারে ও সমাজে ফিরতে পারছি না। আমি নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছি।”
‘কেউ আইন হাতে তুলে নিতে পারেন না’
ঘটনাটি নিয়ে নওগাঁ জজ কোর্টের আইনজীবী বি এম আব্দুল বারী বলেন, মাসুদ রানা যে ঘটনা ঘটিয়েছেন, তা মুসলিম শরিয়াবিরোধী। বাংলাদেশের আইন মুসলিম শরিয়ার বাইরে নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে এ কারণে কাউকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করা সমর্থনযোগ্য নয় বলে জানান এই আইনজীবী।
তিনি বলেন, “মাসুদ রানা যে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন, সেটি মুসলিম শরিয়াবিরোধী। বাংলাদেশের আইন মুসলিম শরিয়ার বাইরে না। তবে, তাকে যেভাবে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে, এটি মোটেও ঠিক না। তিনি যে অপরাধ করেছেন, তার জন্য আইন রয়েছে, আদালত রয়েছে। কেউ আইন হাতে তুলে নিতে পারেন না।”
শ্যালিকাকে বিয়ে করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাসুদ রানা ও পূর্ণিমাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ঘিরে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তবে এ ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কিংবা তাঁদের ওপর সংঘটিত লাঞ্ছনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার আইনগত দিকটি আরও স্পষ্ট হবে।
