ঢাকা বুধবার ২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১২ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১৬ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
প্রচ্ছদ জাতীয় জ্বালানি থেকে মহাকাশ, বাংলাদেশ-জাপান সহযোগিতা বাড়াতে একগুচ্ছ প্রস্তাব

জ্বালানি থেকে মহাকাশ, বাংলাদেশ-জাপান সহযোগিতা বাড়াতে একগুচ্ছ প্রস্তাব

বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ চাইলেন তারেক রহমান

জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও জাপান। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের রাজধানী টোকিওতে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কান্তেই’-তে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও শিল্পায়নের লক্ষ্য অর্জনে জাপান সরকার এবং দেশটির বেসরকারি খাতের আরও সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান তারেক রহমান। বৈঠকটি দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারের প্রচেষ্টার অংশ।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বৈঠকের বিষয়ে তথ্য জানান।

অর্থনীতি ও শিল্পায়নে নতুন সম্ভাবনা

বৈঠকে বাংলাদেশকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটি বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। আর ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের সম্পর্কের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দিকের দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে।

পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা, শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এ সময় নিজের বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুইবার জাপান সফর এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক উন্নয়নে অবদানের কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের পথ অনুসরণ করে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

জ্বালানি নিরাপত্তায় জাপানের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তারেক রহমান। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসায় জাপানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় সাম্প্রতিক ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের বিষয়টিও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

একই সঙ্গে বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

এআই, রোবোটিকস ও মহাকাশ গবেষণায় সহযোগিতার প্রস্তাব

প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর মতে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে জাপানের কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ মেধা, উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তি খাতের দক্ষ জনশক্তির যোগাযোগ বাড়ানো সম্ভব হবে।

প্রস্তাবিত টেক পার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনের মতো খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তুলে ধরেন তিনি।

পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে জাপানের অগ্রসর সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

দ্রুতগতির রেল ও উড়াল সড়ক নির্মাণে সহযোগিতা কামনা

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে আধুনিক ও সমন্বিত যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও বৈঠকে তুলে ধরেন তারেক রহমান।

তিনি জানান, দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বৃহৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়ন, কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়নে জাপানের সহযোগিতা চান তিনি।

আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সংস্কারের অঙ্গীকার

বাংলাদেশে জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে তাঁর সরকার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, করনীতি, শুল্ক ছাড়করণ এবং অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা ও দক্ষতা বাড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকর করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি। এ চুক্তির সুফল দুই দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে উভয় পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

জাতিসংঘ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অভিন্ন অবস্থান

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়েও দুই দেশের সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার বিষয়ে বাংলাদেশের অভিন্ন অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনে জাপানের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। খলিলুর রহমান ২০২৬ সালের ২ জুন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন।

এ ছাড়া একটি অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাপানের সক্রিয় ভূমিকা চান তারেক

মিয়ানমারের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি এবং এর ফলে সৃষ্ট রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ, নির্বিঘ্ন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের জন্য জাপানের সহযোগিতার প্রশংসা করেন তিনি। রাখাইনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে জাপানের সক্রিয় সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে দ্রুত নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।

যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব

বৈঠকের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি এ শীর্ষ বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে তিনি আশাবাদী। আরও গভীর আস্থা, বিস্তৃত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী বিনিয়োগ সম্পর্ক এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে এ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

দুই দেশের অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত চিহ্নিত করা, গৃহীত উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং সহযোগিতার সম্ভাবনাকে কার্যকর প্রকল্পে রূপ দিতে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও জাপানের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বৈঠকে গঠনমূলক আলোচনার মধ্য দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা আরও সুদৃঢ় হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। এ সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

অনুসন্ধান

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদক ও প্রকাশক

মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া (তুহিন)

নির্বাহী সম্পাদক

সোনিয়া রহমান

অফিসঃ

৪৯ মতিঝিল (৮ম তলা), শাপলা ভবন, শাপলা চত্বর, ঢাকা - ১০০০

ই-মেইলঃ

rightwayciezs@gmail.com

টেলিফোনঃ

+৮৮ ০১৭১২-৭৭৭ ৩৬৩

মার্কেটিংঃ

+৮৮ ০১৯৪৮- ৯০০ ৯১১

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব rightwaynews24.com কর্তৃক সংরক্ষিত