ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য জীবন বাজি রাখা নারী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো পেলেন ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার। বছরের পর বছর গোপনে থেকে, নির্যাতন আর নিপীড়নের মুখে দাঁড়িয়ে নিজের দেশকে স্বৈরশাসনের হাত থেকে মুক্ত করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সেই সাহস ও আত্মত্যাগেরই স্বীকৃতি এসেছে এই পুরস্কারের মাধ্যমে।
তবে মাচাদোর এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং তা ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের সংগ্রাম, স্বপ্ন ও স্বাধীনতার আর্তনাদের প্রতিফলন।
স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একা এক যোদ্ধা
৫৮ বছর বয়সী এই শিল্পপ্রকৌশলী নারীকে ২০২৪ সালে আদালত রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরিয়ে দেয়। তাতে যেন তিনি আরও দৃঢ় হয়ে ওঠেন। মাচাদো তখন তার স্থলাভিষিক্ত প্রার্থী, সাবেক রাষ্ট্রদূত এডমুন্ডো গনসালেজের পক্ষে মাঠে নামেন। হাজারো মানুষের ভিড়ে, পুলিশের নজরদারির মাঝেও তিনি গণতন্ত্রের ডাক পৌঁছে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের কানে।
তবে তার এই সাহসিকতার মূল্য দিতে হয়েছে চড়া দামে। প্রচারণাকালে তার নিরাপত্তা প্রধানসহ বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এমনকি তার টিমের ছয়জন সদস্য আশ্রয় নেন আর্জেন্টিনার দূতাবাসে। তবুও থেমে থাকেননি মাচাদো।
পুরস্কার প্রাপ্তির খবর শুনে ফোনে কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে তার। নোবেল কমিটির কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, “হে ঈশ্বর… আমি বাকরুদ্ধ। আমি এই পুরস্কারের যোগ্য নই।”
অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারবেন কি না, অনিশ্চিত
আগামী ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের রাজধানী অসলোতে অনুষ্ঠিত হবে পুরস্কার বিতরণী। কিন্তু মাচাদো সেখানে উপস্থিত থাকতে পারবেন কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। যদি তিনি যেতে না পারেন, তাহলে তিনি সেই সাহসী মানুষদের সারিতে থাকবেন, যারা নিপীড়নের কারণে নোবেল শান্তি পুরস্কার হাতে নিতে পারেননি—যেমন আন্দ্রেই সাখারভ, লেখ ভালেসা বা অং সান সুচি।
মাচাদো প্রথম ভেনেজুয়েলান যিনি শান্তি পুরস্কার পেলেন, এবং লাতিন আমেরিকার ষষ্ঠ নাগরিক হিসেবে তার নাম ইতিহাসে লেখা হলো।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর জানিয়েছে, “এই পুরস্কার ভেনেজুয়েলার জনগণের মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।”
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির প্রধান ইয়রগেন ফ্রিডনেস বলেন, “আমরা আশা করি, এই পুরস্কার বিরোধী দলকে নতুন উদ্যমে অনুপ্রাণিত করবে, যাতে তারা শান্তিপূর্ণ উপায়ে স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তরের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারে।”
আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোচনায়ও প্রতিধ্বনি
এই ঘোষণার আগে থেকেই সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করে আসছিলেন, শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত তারই। কিন্তু নোবেল কমিটি আবারও দেখিয়ে দিল, তারা কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা জনপ্রিয় চাপে নয়, বরং সত্যিকার সাহসী মানুষদের স্বীকৃতি দেয়।
বিশ্লেষক হালভার্ড লেইরা বলেন, “নোবেল কমিটি প্রমাণ করেছে যে, তারা কোনো সরকারের মুখপাত্র নয়—তারা মানবতার কণ্ঠস্বর।”
যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের পক্ষে। সম্প্রতি তারা ভেনেজুয়েলা উপকূলে মাদকবাহী বেশ কয়েকটি জাহাজ আটক করেছে। ট্রাম্প এমনকি বলেছিলেন, দেশটির মাদক কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ও বিবেচনায় আছে।
“আমি একা নই, পুরো ভেনেজুয়েলা আজ কথা বলছে”
বিশ্বজুড়ে যখন গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ বাড়ছে, তখন মাচাদোর পুরস্কার যেন এক নতুন আশার স্ফুলিঙ্গ। নিজের দেশে নিষেধাজ্ঞা, কারাবরণ আর ভয়কে পেছনে ফেলে তিনি এখন স্বাধীনতার প্রতীক।
ভেনেজুয়েলার হাজারো তরুণ-তরুণী, যারা মাচাদোর সভায় মোমবাতি জ্বালিয়ে স্বাধীনতার শপথ নেয়, তাদের কণ্ঠেই তিনি বলেন—“আমি একা নই, পুরো ভেনেজুয়েলা আজ কথা বলছে।”
এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রাউন (প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার)। এটি প্রদান করা হবে আগামী ১০ ডিসেম্বর, নোবেল পুরস্কারের প্রবর্তক আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে।
