শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে যেকোনো সময় পদত্যাগ করতে পারেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন—রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এমন গুঞ্জন তুঙ্গে। সরকারের উচ্চপর্যায় ও বিএনপি সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে এ খবর ছড়িয়ে পড়লেও, বঙ্গভবন বা সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট বা আনুষ্ঠানিক বার্তা পাওয়া যায়নি।
তবে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের জল্পনা-কল্পনার মাঝেই নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকেই কারও আসা প্রায় নিশ্চিত বলে দলটির একাধিক সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে।
আলোচনায় বিএনপির তিন বর্ষীয়ান নেতা
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির ভেতরে ও বাইরে বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী নাম নিয়ে আলোচনা চলছে। দৌড়ে এগিয়ে আছেন:
-
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: বিএনপির বর্তমান মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী।
-
ড. আব্দুল মঈন খান: সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য।
-
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন: সাবেক স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং বিএনপি স্থায়ী কমিটির বর্ষীয়ান সদস্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ড. আব্দুল মঈন খান কিংবা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বর্তমান সরকারের মন্ত্রীসভায় স্থান না পাওয়ায়, তাদের হয়তো নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের মতো সম্মানজনক সাংবিধানিক পদের জন্যই বিবেচনা করা হচ্ছে।
বঙ্গভবন সূত্র: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তা জানান, “রাষ্ট্রপতি সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর নিকটাත්මদের কাছে একাধিকবার নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা তুলে ধরে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন।”
পদত্যাগ নিয়ে সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন সম্পর্কে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত কিছু জানি না, এটি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়।”
অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “রাষ্ট্রপতি যদি স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করতে চান, তবে সংবিধান অনুযায়ী তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছেই পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। এটি সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত, এতে সরকারের কিছু করার নেই। পদত্যাগের বিষয়ে যে গুঞ্জন চলছে, তা বাস্তবে রূপ নিলে তখন দেখা যাবে।”
সাংবিধানিক নিয়ম কী বলে?
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নঈম আক্তার সিদ্দিক জানান, সংবিধানে পদত্যাগের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে:
-
অনুচ্ছেদ ৫০(৩): স্পিকারের উদ্দেশে নিজ স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারবেন।
-
অনুচ্ছেদ ৫৪: রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতিতে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
-
অনুচ্ছেদ ১২৩(২): মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক সমীকরণ
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেয়াদে আসেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তিনি পদে বহাল ছিলেন। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করার পর বঙ্গভবনে ক্ষমতার এই ভিন্নতা নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়। বর্তমানে স্বাস্থ্যগত কারণে তাঁর পদত্যাগের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায়, নতুন রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন এখন দেশের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
