ঢাকা শুক্রবার ১৭ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২রা সফর, ১৪৪৮ হিজরি
প্রচ্ছদ অর্থনীতি ৫ ব্যাংকের একীভূতকরণ: ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা, নাকি নতুন আর্থিক ফাঁদ?

৫ ব্যাংকের একীভূতকরণ: ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা, নাকি নতুন আর্থিক ফাঁদ?

বছরের পর বছর ধরে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি, অর্থ পাচার ও নজিরবিহীন সুশাসনের অভাবে দেশের ইসলামী ধারার পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংক এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বিপুল খেলাপি ঋণ, প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি মূলধন ঘাটতি এবং চরম তারল্য সংকটে ধুঁকতে থাকা এই ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন একটি ব্যাংক গঠনের চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—এই পদক্ষেপ কি দেশের ব্যাংক খাতে নতুন করে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে, নাকি সংকটকে স্রেফ এক খাতা থেকে অন্য খাতায় স্থানান্তর করে আরও বড় আর্থিক ঝুঁকির জন্ম দেবে?

কেন এই চরম বিপর্যয়?

আজকের এই সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বেনামি ঋণ বিতরণের ফলে ব্যাংকগুলো ফোকলা হয়ে পড়েছে।

  • এস আলম ও অন্যান্য গ্রুপের লুটপাট: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কেবল এস আলম গ্রুপই বেনামি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে এই ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ বের করে নিয়েছে। এছাড়া বেক্সিমকো ও নাসা গ্রুপসহ প্রভাবশালী বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ লুটে নিয়েছে।

  • অর্থ পাচার: অভিযোগ রয়েছে, এসব ঋণের বড় অংশই দেশে বিনিয়োগ না হয়ে বিদেশে পাচার হয়েছে। ফলে ঋণের টাকা আর ব্যাংকে ফেরত আসেনি।

উদ্বেগের মূল জায়গা: ভয়াবহ পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক অডিট ও একিউআর (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ) প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো:

  • আমানত বনাম ঋণ: ব্যাংক পাঁচটিতে গ্রাহকদের মোট আমানত প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা

  • খেলাপি ঋণের পাহাড়: বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকাই খেলাপি বা আদায়-অযোগ্য। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে ৭৭ টাকাই এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংকে এই হার ৯৮ শতাংশ ছুঁয়েছে।

  • মূলধন ঘাটতি: ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি ছাড়িয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকগুলোর নিজের ক্ষতি বহনের সক্ষমতা সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে।

একীভূত করার সিদ্ধান্ত: সমাধানের খোঁজে সরকার

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই ব্যাংকগুলোকে আলাদাভাবে বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। গ্রাহকরা টাকা তুলতে পারছেন না, আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বারবার তারল্য সহায়তা দিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না।

তাই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে একটি বড় ও শক্তিশালী ব্যাংক গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে একক মূলধন কাঠামো, শক্তিশালী তদারকি এবং সমন্বিত প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাংকটিকে ধীরে ধীরে পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এটি কি আসলেই জাদুকরী কোনো সমাধান?

অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, স্রেফ নাম বদলানো বা কাগজে-কলমে প্রশাসনিক একীভূতকরণ কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। নতুন ব্যাংকটির সফলতা নির্ভর করছে মূলত ৩টি বিষয়ের ওপর:

১. আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে কতটা খেলাপি ঋণ আদায় করা সম্ভব হবে।

২. কত দ্রুত তারল্য সংকট কাটানো যাবে।

৩. আমানতকারীদের মনে কত দ্রুত আস্থা ফিরিয়ে আনা যাবে।

“এটি একটি নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ”

সংকটে থাকা পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার বিষয়টিকে বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন নতুন গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান কাজী শাইরুল হাসান। তিনি বলেন:

“পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে একটি ব্যাংক গঠনের নজির বিশ্বে খুব একটা নেই। এটি আমাদের জন্য এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ। আমরা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ব্যাংকটিকে আবারও ঘুরে দাঁড় করানো এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।”

এই নজিরবিহীন একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলবে, নাকি পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও গভীর সংকটে ফেলবে—তা সময়ই বলে দেবে।

0 FacebookTwitterPinterestEmail

অনুসন্ধান

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদক ও প্রকাশক

মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া (তুহিন)

নির্বাহী সম্পাদক

সোনিয়া রহমান

অফিসঃ

৪৯ মতিঝিল (৮ম তলা), শাপলা ভবন, শাপলা চত্বর, ঢাকা - ১০০০

ই-মেইলঃ

rightwayciezs@gmail.com

টেলিফোনঃ

+৮৮ ০১৭১২-৭৭৭ ৩৬৩

মার্কেটিংঃ

+৮৮ ০১৯৪৮- ৯০০ ৯১১

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব rightwaynews24.com কর্তৃক সংরক্ষিত