ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। দেশটির নির্বাচনী রাজনীতিতে কোনো একটি দলের পক্ষে এককভাবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা কঠিন। ফলে নির্বাচনের পর বিভিন্ন দলকে জোট গঠন করে সরকার পরিচালনার পথ খুঁজতে হয়। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিও সর্বশেষ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। পরে উগ্র ডানপন্থি দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়ে ক্ষমতায় আসে তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার প্রকাশিত নির্বাচনী জরিপে নেতানিয়াহুর জোট ও প্রধান বিরোধী জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন প্রায় পাঁচ লাখ তরুণ ইসরায়েলি। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৭০ হাজার ইসরায়েলি নাগরিক শুধু ভোট দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশে ফিরছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আলজাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটির কোনো রাজনৈতিক দল এককভাবে নেসেটের ৬১টি আসন পায়নি। এ কারণে সরকার গঠনে বরাবরই জোটের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এবারের নির্বাচনেও সেই সমীকরণ নেতানিয়াহুর ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
নেতানিয়াহুর সামনে চ্যালেঞ্জ গাদি আইজেনকোত
এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোত। নির্বাচনী জরিপে তাঁর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা দেখা গেলেও, বেশি আসন পাওয়া মানেই সরাসরি সরকার গঠন নিশ্চিত হওয়া নয়।
আলজাজিরার উদ্ধৃত একটি জরিপে বলা হয়েছে, আইজেনকোতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৫২টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৫০। এই হিসাব অনুযায়ী, কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারছে না। ফলে ছোট দলগুলোর সমর্থন শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
নেতানিয়াহুর জোট প্রত্যাশার তুলনায় কম আসন পেলেও অন্য ডানপন্থি দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করতে পারে। একইভাবে বিরোধী জোটও প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে পারলে সরকার গঠনের সুযোগ পাবে। তাই নির্বাচনে কোন দল কতটি আসন পেল, তার পাশাপাশি নির্বাচনের পর কে কাদের সঙ্গে জোট গড়তে পারছে, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ক্ষমতার সমীকরণে ফিলিস্তিনি ইসরায়েলিদের ভূমিকা
এবারের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব দলগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে জয়েন্ট লিস্ট ও রা’মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জরিপের হিসাব অনুযায়ী, দল দুটি মিলিয়ে ১৩টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিক। তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর আসনসংখ্যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে প্রধান দুই জোটের কেউই ৬১ আসন নিশ্চিত করতে না পারলে এসব দলের সমর্থন চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২১ সালে রা’ম তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন দিয়ে সরকার গঠনে সহায়তা করেছিল। ইসরায়েলের ইতিহাসে সে সময় প্রথমবারের মতো একটি আরব দল সরকার গঠনের জোটে অংশ নেয়। সেই নজির এবারের নির্বাচন-পরবর্তী সমঝোতার আলোচনাতেও গুরুত্ব পেতে পারে।
রা’মের নেতা মানসুর আব্বাস জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী জোটের অতিরিক্ত আসন বা সমর্থন প্রয়োজন হলে তিনি সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তাঁর এই অবস্থান বিরোধী শিবিরের সরকার গঠনের সম্ভাবনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের এবারের নির্বাচন শুধু নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তার পরীক্ষা নয়; বরং দেশটির জোটভিত্তিক রাজনীতিরও বড় পরীক্ষা। ভোটের ফলাফলে কে এগিয়ে থাকবেন, তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন কে নিশ্চিত করতে পারবেন, সেটিই নির্ধারণ করবে ইসরায়েলের পরবর্তী নেতৃত্ব। ফলে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরও সরকার গঠনের দর-কষাকষি এবং ছোট দলগুলোর অবস্থান রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে।
সূত্র: আলজাজিরা, রয়টার্স
