ঢাকা সোমবার ২৬শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ১০ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১৪ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
প্রচ্ছদ আন্তর্জাতিক নতুন প্রজন্মের তোপের মুখে; ইউরোপের রাজনীতি কোন পথে?

নতুন প্রজন্মের তোপের মুখে; ইউরোপের রাজনীতি কোন পথে?

আবাসন সংকট, আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা—এমন নানা সমস্যা ঘিরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আন্দোলনে নেমেছে তরুণ প্রজন্ম বা জেন-জি। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, বেলজিয়াম, আলবেনিয়া, গ্রিস ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া এসব বিক্ষোভ চাপ তৈরি করছে সরকারগুলোর ওপর। তরুণদের দাবি, ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে শিক্ষা, আবাসন ও কর্মসংস্থানে আরও বেশি সরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

দেশভেদে আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ আলাদা হলেও তরুণদের অসন্তোষের জায়গায় রয়েছে বেশ কিছু মিল। অনেকের অভিযোগ, আগের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমানে একটি বাড়ি কেনা বা ভাড়া নেওয়া, মানসম্মত শিক্ষা অর্জন এবং স্থিতিশীল চাকরি পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে তরুণদের মধ্যে। একই সঙ্গে সরকারের নীতি ও অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা।

স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাস্কালকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা তরুণদের প্রতিবাদের অন্যতম উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। আবাসনসংকট ও উচ্ছেদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়ে রাস্তায় নেমেছেন অনেকে। তাঁদের কাছে এই ঘটনা শুধু একজন প্রবীণ নারীর বাড়ি হারানোর বিষয় নয়; বরং ইউরোপে সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী আবাসন পাওয়ার ক্রমবর্ধমান সংকটেরও প্রতীক।

ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষকদের সংকট নিরসন এবং স্কুলের অবকাঠামো শক্তিশালী করার দাবিতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সঙ্গে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। দেশটির প্রধান ছাত্র সংগঠন ‘ইউএনইএফ’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস ডি ব্রিটো মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আন্দোলনে বিরোধের চেয়ে মিলই বেশি। শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং তরুণদের জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসনসংকট মোকাবিলাও তাঁদের দাবির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ অবশ্য নতুন নয়। শিক্ষার্থীরা প্রায় নয় বছর ধরে এ ধরনের সমস্যা নিয়ে আন্দোলন করে আসছেন। ব্রিটোর ভাষায়, দীর্ঘদিন ধরে উত্তর ও সমাধানের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তাঁর এই বক্তব্য তরুণদের মধ্যে জমে থাকা হতাশারই প্রতিফলন।

ইতালির রাজধানী রোমেও আবাসনসংকট শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এলিসা পাস্তোরে সিএনএনকে জানান, তিনি ও তাঁর ভাই মিলে যে কক্ষে থাকেন, সেই কক্ষের ভাড়া জোগাড় করতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আবাসন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবন সামলানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

একই সংকট নিয়ে পর্তুগালেও বিক্ষোভ হয়েছে। দেশটির রাজধানী লিসবনে হাজার হাজার মানুষ সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে জড়ো হন। তাঁদের দাবি, আবাসনকে কেবল বাজারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে রাখার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ইতালি ও গ্রিসে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকেরা উন্নত বিদ্যালয়, বিনামূল্যে সরকারি শিক্ষা এবং জনসেবামূলক খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের অনেকে ‘গ্রিস থেকে ফ্রান্স—সবার জন্য উন্মুক্ত ও বিনামূল্যে শিক্ষা চাই’—এমন স্লোগান দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, শিক্ষার সুযোগ ও ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ এখন আর কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

আলবেনিয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিলে প্রধানমন্ত্রী এদি রামা তাঁর পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। একই সঙ্গে অস্থিরতার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দায়ী করেন তিনি। তবে বিক্ষোভকারীদের একাংশের দাবি, তাঁরা কেবল কিছু নীতির পরিবর্তন চান না; বরং রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও পরিবর্তন প্রত্যাশা করছেন।

রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে এক বিক্ষোভকারী বলেন, তাঁরা পরিবর্তন চান বলেই রাস্তায় নেমেছেন। তাঁর ভাষায়, তাঁরা বিপ্লব ও নতুন সরকার চান এবং দ্রুত রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখতে চান। এ ধরনের বক্তব্য আন্দোলনের একাংশের মধ্যে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি গভীর অসন্তোষের ইঙ্গিত দেয়।

আলবেনিয়ায় বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প নিয়েও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। আবাসন ও নগর উন্নয়নের প্রশ্নে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের চেয়ে অভিজাতদের স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিক্ষোভকারীরা।

আবাসন ও শিক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বিগ্ন ইউরোপের তরুণেরা। শ্রমবাজারের পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তন তাঁদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে চাকরির ধরন বদলে যাওয়া এবং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ কতটা স্থিতিশীল থাকবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে তরুণদের মধ্যে।

বেলজিয়ামভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ইউরোপিয়ান করেসপন্ডেন্ট’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক জুলিয়াস ফিনটেলম্যানের মতে, এসব বিক্ষোভ সরকারের প্রতি তরুণদের হতাশার প্রকাশ। তিনি বলেন, ইউরোপের রাজনীতি পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে—এমন একটি ধারণা তরুণদের মধ্যে তৈরি হয়েছে।

আন্দোলনের বিস্তৃতি ও দাবির মধ্যে মিল থাকলেও সব দেশের পরিস্থিতি এক নয়। কোথাও আবাসনসংকট আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু, কোথাও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, আবার কোথাও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের দাবি সামনে এসেছে। তবে এসব আন্দোলনের পেছনে একটি সাধারণ প্রশ্ন কাজ করছে—বর্তমান ব্যবস্থা কি তরুণদের জন্য নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারছে?

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আন্দোলনের পাশাপাশি নতুন কর্মসূচিও ঘোষণা করা হচ্ছে। জার্মানিতে ‘জেন জেড রেগেল্ট’ বা ‘জেন-জি সব সামলে নেবে’ নামে একটি গোষ্ঠী ৩১ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। স্পেনের ট্রেড ইউনিয়নগুলো ১১ নভেম্বর সাধারণ ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, ব্রিটেন ও ইতালির ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে ২০ নভেম্বর কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করছে।

সব মিলিয়ে, ইউরোপজুড়ে জেন-জির আন্দোলন শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদি সংকট। তরুণদের দাবি পূরণে সরকারগুলো কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর এসব আন্দোলনের ভবিষ্যৎ ও রাজনৈতিক প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করবে।

সূত্র : সিএনএন, এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড

0 FacebookTwitterPinterestEmail

অনুসন্ধান

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদক ও প্রকাশক

মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া (তুহিন)

নির্বাহী সম্পাদক

সোনিয়া রহমান

অফিসঃ

৪৯ মতিঝিল (৮ম তলা), শাপলা ভবন, শাপলা চত্বর, ঢাকা - ১০০০

ই-মেইলঃ

rightwayciezs@gmail.com

টেলিফোনঃ

+৮৮ ০১৭১২-৭৭৭ ৩৬৩

মার্কেটিংঃ

+৮৮ ০১৯৪৮- ৯০০ ৯১১

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সকল স্বত্ব rightwaynews24.com কর্তৃক সংরক্ষিত