মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় থাকার সময়টিকে ইরানের সঙ্গে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে দেখছে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ। ইরান যুদ্ধের আট মাস পেরিয়ে গেলেও ওয়াশিংটন যেমন তেহরানকে নিজেদের শর্তে আনতে পারেনি, তেমনি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার সুস্পষ্ট পথও খুঁজে পায়নি। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট মনিটর’-এ প্রকাশিত এক কলামে এমন বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। দুই পক্ষই এমন কিছু শর্তে অনড় রয়েছে, যা আলোচনার পথ সংকুচিত করছে। তেহরান আলোচনায় ফেরার আগে নিষেধাজ্ঞা ও হুমকি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে নেওয়ার বিরোধিতা করছে তারা। অন্যদিকে ট্রাম্পের বক্তব্যেও ইরানের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ পেয়েছে।
কলামটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের ইরাননীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে ৩৯ শতাংশে নেমেছে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। ফলে রিপাবলিকান দলের প্রার্থীদের জন্যও ইরান যুদ্ধ একটি রাজনৈতিক চাপ হয়ে উঠেছে।
লেখাটিতে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ তিনবার ইরানে যুদ্ধ পরিচালনায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করার পক্ষে ভোট দিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের কেউ কেউ জ্বালানির দাম কমাতে যুদ্ধ শেষ করার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। নির্বাচনে দলের সম্ভাব্য পরাজয়ের আশঙ্কায় ট্রাম্প ভোটের আগে ইরানে নতুন হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে কলামে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই সময়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডকে আবার সামরিক অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
লেখকের আশঙ্কা, নির্বাচনের আগে কিংবা রিপাবলিকানরা পরাজিত হলে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেন। কারণ, নির্বাচনে দলের আসন হারানোর আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হলে তাঁর রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। তবে হামলা চালিয়েও জনমত পরিবর্তন করা সহজ হবে না। কলামে উদ্ধৃত ‘পলিটিকো’র এক জরিপ অনুযায়ী, ৪৬ শতাংশ ভোটার বলেছেন, নির্বাচনের আগে যুদ্ধ শেষ হলেও তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত বদলাবে না।
এদিকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত করার পাশাপাশি দেশটির পক্ষ থেকে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোয় পাল্টা হামলার হুমকির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতিও আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের অবস্থানেও ভিন্নতার ইঙ্গিত
কলামটিতে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অবস্থান নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শুরু থেকেই যুদ্ধের বিরোধী হিসেবে পরিচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিতেও তিনি অনাগ্রহ দেখিয়েছেন বলে লেখাটিতে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও একই সময়ে ভারত সফরে ছিলেন। কলামটির ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর সফরের মূল গুরুত্ব ছিল বাণিজ্য, ইরান সংকট নয়। বিপরীতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইসরায়েল সফর করে দেশটির প্রতি নিজের সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন। লেখক মনে করছেন, যুদ্ধের পরিণতি খারাপ হলে হেগসেথকে দায়ী করার চেষ্টা হতে পারে।
ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা নিয়েও নতুন করে ভাবছে উপসাগরীয় দেশগুলো—এমনটাই দাবি করা হয়েছে কলামটিতে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। লেখাটির বর্ণনা অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেওয়ার পর আবুধাবি এখন ওয়াশিংটনের ওপর এককভাবে নির্ভর না করে তেহরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ খুঁজছে। এ উদ্দেশ্যে ইরানের সঙ্গে একটি পরোক্ষ যোগাযোগের চ্যানেলও চালু করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
কলামটিতে আরও বলা হয়েছে, ইয়েমেন পরিস্থিতি ঘিরেও উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সৌদি আরব হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাইলেও ওয়াশিংটন দুবার সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরিবর্তে সংযুক্ত আরব আমিরাত দক্ষিণ ইয়েমেনে হুথিবিরোধী বাহিনীকে অর্থায়নে সম্মত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। লেখকের মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংঘাতে জড়ানো এড়িয়ে গেলেও আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে চাপ বজায় রাখার সুযোগ পাচ্ছে।
সৌদি আরবকে বার্তা দিচ্ছে তেহরান?
ইরানের কৌশলের কেন্দ্রে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে মনে করছে কলামটির লেখক। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তেহরানের নেতারা মনে করছেন, আরও এক থেকে দেড় বছর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব। এর মধ্যে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বদলে যেতে পারে।
সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক যোগাযোগের প্রসঙ্গ টেনে লেখক এ ধারণার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। কলামে বলা হয়েছে, হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের একটি বিমানবন্দরে অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন। ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর বরাত দিয়ে এতে দাবি করা হয়েছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কর্মকর্তারা ওই হামলায় দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। তবে হামলার কয়েক দিন পরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি আরবের সঙ্গে যোগাযোগ করে হুথিদের নিয়ে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেন এবং সংকটের সামরিক সমাধান নেই বলে মন্তব্য করেন।
লেখকের ব্যাখ্যায়, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য কেবল সৌদি অবকাঠামোর ক্ষতি করা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-প্রতিশ্রুতির কার্যকারিতা নিয়ে রিয়াদের মনে প্রশ্ন তৈরি করা। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার সম্ভাব্য মূল্য সম্পর্কেও সৌদি আরবকে সতর্ক করা হতে পারে। তবে এটি কলাম লেখকের বিশ্লেষণ; ইরানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে একে দেখার সুযোগ নেই।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও গুরুত্বপূর্ণ
ইরান সংকটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন লেখক। কলামটিতে বলা হয়েছে, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শেষ করার সুযোগ দিতে সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েল নতুন হামলা ২৭ অক্টোবরের ভোটের পর চালানোর অনুরোধ জানিয়েছে বলে লেখাটিতে উল্লেখ রয়েছে।
জরিপে নেতানিয়াহুর জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন না পাওয়ার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের মতে, রাজনৈতিকভাবে দুর্বল কোনো অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্বের কাছে ইরান সংকট দীর্ঘায়িত হওয়া রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারে।
ভবিষ্যতে গ্যাডি আইজেনকোটের মতো কোনো নতুন নেতা ক্ষমতায় এলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান পুরোপুরি বদলে যাবে—এমনটা মনে করেন না লেখক। তবে নতুন নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর ইসরায়েলের নিরাপত্তা পুরোপুরি নির্ভরশীল রাখতে চাইবে না বলেই তাঁর ধারণা। যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ইরান প্রশ্নে পিছু হটলে ইসরায়েল এককভাবে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত কৌশল বদলাতে পারে এবং সৌদি আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগও আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, কলামটির মূল বক্তব্য হলো—ইরান যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ইসরায়েলের নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা হিসাবেও বড় পরিবর্তন আনছে। লেখকের মতে, তেহরান ও উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বিকল্প পথ খুঁজছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে ইরান সংকটের সমীকরণও নতুনভাবে সাজানো হতে পারে।
