আগামী অর্থবছরের মধ্যে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। গ্রাম পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি, ক্যানসার চিকিৎসার আধুনিকায়ন এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের মতো একাধিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্যসেবার চিত্র বদলে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটারে আয়োজিত ‘মেডিকেল ফিজিক্স কার্যক্রমের উদ্বোধন’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইউনিয়নের প্রতি তিনটি ওয়ার্ডে একটি করে ফ্যামিলি ওয়েলবিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হবে। বর্তমানে চালু থাকা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে পর্যায়ক্রমে হেলথ ওয়েলবিং সেন্টারে রূপান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর করতে প্রত্যেক নারী ও পুরুষের রোগের ইতিহাস, জন্মসংক্রান্ত তথ্য, ওজন, উচ্চ রক্তচাপসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যতথ্য নথিভুক্ত করে কার্ড দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। আগামী অর্থবছরের মধ্যে এসব উদ্যোগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা খাতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ক্যানসার চিকিৎসায় যুক্ত হচ্ছে ১৭টি রেডিওথেরাপি যন্ত্র
দেশে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে ১৭টি লিনিয়ার এক্সিলারেটর বা রেডিওথেরাপি যন্ত্র আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এসব যন্ত্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বাংকার নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ চলছে। আগামী অর্থবছরে আরও বাংকার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, আটটি বিভাগে রেডিওথেরাপি সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি জেলা পর্যায়েও এ চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এর ফলে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ বাড়বে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য দূরবর্তী স্থানে যাওয়ার প্রয়োজন কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তবে শুধু আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করলেই ক্যানসার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়বে না বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। এসব যন্ত্র পরিচালনা এবং সঠিকভাবে চিকিৎসার মাত্রা নির্ধারণের জন্য দক্ষ জনবল নিশ্চিত করাও জরুরি।
নিয়োগ দেওয়া হবে মেডিকেল ফিজিসিস্ট
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রেডিওথেরাপি চিকিৎসায় মেডিকেল ফিজিসিস্টদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর জন্য বিকিরণের সঠিক মাত্রা নির্ধারণে তাঁদের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভুল হলে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে এবং চিকিৎসকের পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ কারণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেডিকেল ফিজিসিস্ট নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জনবলের চাহিদা নির্ধারণ করে দ্রুত প্রস্তাব প্রস্তুত করতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি প্রশাসনের কাছে পাঠিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে প্রযুক্তিবিদ ও নার্সদের
ক্যানসার চিকিৎসার আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, টেকনিশিয়ান ও নার্স তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, চিকিৎসাসেবার বিভিন্ন ইউনিটে প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি নার্সদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে প্রশিক্ষিত কর্মী নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
এ ছাড়া দেশে প্রথমবারের মতো পাঁচটি রোবোটিক সার্জারি যন্ত্র আনার পরিকল্পনার কথাও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এসব যন্ত্র যুক্ত হলে আধুনিক অস্ত্রোপচারসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মেডিকেল ফিজিক্স শিক্ষায় গুরুত্ব
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল ফিজিক্স কার্যক্রমের প্রশংসা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় মেডিকেল ফিজিক্স একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বিশেষ করে ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপির সঠিক প্রয়োগ ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবলের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি জানান, দেশে মেডিকেল ফিজিসিস্টের সংখ্যা বাড়াতে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরিতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে সরকার সহযোগিতা করবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি, ইউনিয়নভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যতথ্য সংরক্ষণ, ক্যানসার চিকিৎসার আধুনিকায়ন এবং দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব পরিকল্পনার সুফল পেতে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং নিয়মিত সেবার মান নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
